সহিংসতা-অসহিষ্ণুতার প্রলম্বিত ছায়া

একের পর এক নৃশংস ও লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে পারিবারিক-সামাজিক ক্ষেত্রে। এই বীভত্স চিত্র আমাদের সমাজ-বাস্তবতায় নতুন কিছু না হলেও সাম্প্রতিক কালের কিছু ঘটনা ও অপরাধের কৌশলের ধরন পরিবর্তনের চিত্র যে কোনো শুভবোধসম্পন্ন মানুষকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না। ক্রমবর্ধমান এ রকম নৃশংসতা-অসহিষ্ণুতা সমাজদেহে ক্ষত ক্রমাগত যেভাবে গভীর কিংবা বিস্তৃত করছে, এর বিরূপ প্রভাব জননিরাপত্তা এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তা সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় আরো স্পষ্ট হবে। একটি ঘটনার রেশ কাটতে-না-কাটতেই জন্ম হচ্ছে আরেকটি বীভত্স ঘটনার। সংবাদমাধ্যমে ঘটনাগুলোর আড়ালের ঘটনা অনুসন্ধানে যেসব চিত্র উঠে আসছে, তা যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।

সমাজবিজ্ঞানী-অপরাধবিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে এমন ঘটনার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির যে দিকগুলো চিহ্নিত করেছেন তা মোটেও স্বস্তির বিষয় নয়। আকাশসংস্কৃতির কারণে প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মানুষের মধ্যে সাধ্যের অধিক ভোগবিলাসী জীবনযাপনের প্রবণতা কিংবা বেপরোয়া ভাব সমাজদেহ বিষিয়ে তুলছে। যে পরিবার সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান, সেই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নৈতিকতার স্থান ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। দাম্পত্য কিংবা পারিবারিক জীবনে যদি না থাকে প্রাণবন্ততা কিংবা একে অন্যের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা, তাহলে মানবিক সম্পর্কের গ্রন্থিগুলো ছিঁড়ে যেতেই পারে। আমরা দেখেছি, এই আধুনিককালে মানবিক সম্পর্কগুলো কীভাবে যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ তার অন্তর্গত ও অপরিহার্য মনুষ্যত্ব রক্ষা করতে পারছে না হূদয়ের অনুশাসন মেনে।

পিতার হাতে পুত্র, পুত্রের হাতে পিতা, এমনকি মায়ের হাতে সন্তান হত্যার অচিন্তনীয় খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। এর বাইরে সামাজিক নানা ক্ষেত্রে স্বার্থান্বেষী রাজনীতির কারণে সৃষ্ট বহুবিধ নেতিবাচকতা ও বলবান চক্রের উদর ভরার নানারকম পাঁয়তারা ইত্যাদি দুষ্কর্মমূলক ভাবনার প্রতিফলন সমাজ-পরিবারে, এমনকি রাষ্ট্রের অন্যান্য ক্ষেত্রেও অপচ্ছায়া বিস্তার করে চলেছে। দীর্ঘস্থায়ী করোনা দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট নানামুখী অভিঘাতের বিরূপতা অস্বীকার করা যাবে না সত্য; কিন্তু সামাজিক-পারিবারিক ক্ষেত্রে সহিংসতা-অসহিষ্ণুতার পারদ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার এটাই একমাত্র কারণ নয় বলেও মনে করি। এই দুর্যোগের আগে দূর-অতীত বাদ দিলেও যদি আমরা বিগত এক দশকের অপরাধের পরিসংখ্যান মেলাই, তাহলে কি ভয়াবহ আরো অনেক কিছুই দেখতে পাই না? সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে অন্যের প্ররোচনা-প্রলোভন কিংবা আরো অনেক বেশি হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার চক্রান্তের কারণে।

যে কোনো সভ্য আধুনিক-গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতি অত্যন্ত নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। শুদ্ধ রাজনীতিহীন সমাজ যেন মজা পুকুর। বিশ্বের দেশে দেশে মানুষের অধিকার নিশ্চিত ও জীবনযাপনের সব পথ সুগম করার এই জরুরি অনুষঙ্গের প্রতি বিশেষ জোর দিয়ে আসছেন রাষ্ট্র-সমাজ-রাজনীতির নীতিনির্ধারকরা। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যে প্রত্যয় ও সুস্পষ্ট অঙ্গীকারগুলো ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে এ থেকে ক্রমান্বয়ে সরে আসার পেছনে রাজনীতির নামে অপরাজনীতি এবং একই সঙ্গে ক্ষমতার সর্বগ্রাসী মোহ যে জীবনবৈরী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, এর মাশুল আমাদের বহুভাবে দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। এর পরও রাজনৈতিক আবরণেই অঘটন তো আরো কম ঘটেনি। এমন একটি রাষ্ট্রের সমাজে অন্ধকার বিস্তৃত হবে, এটাই স্বাভাবিক এবং তা-ই আক্রান্ত করেছে কিংবা করছে পরিবারকেও।

একেকটি ঘটনার নানারকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হতে পারে কিংবা মাত্রা ও প্রকৃতিগত দিক থেকে মানুষের নৃশংসতা ও সামাজিক সহিংসতার ফলে ক্রমান্বয়ে গড়ে ওঠা ভয়াবহ অবস্থার গভীরতা খুঁজতে আরো কিছু অনুষঙ্গের ওপর নির্ভর করা যেতে পারে। কিন্তু মানুষ কেন এত নৃশংস হয়ে উঠছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে উল্লিখিত বিষয়গুলোর দিকেও অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলেই মনে করি। সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি সমাজের বলবান কিংবা ক্ষমতাবানগোষ্ঠীর নিজেদের লাভালাভের ছক কষা এবং একই সঙ্গে এসবের বাস্তবায়নে নানামুখী অপকৌশলের ফলে পরিবার-সমাজ সহিংসতাকবলিত হচ্ছে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথ কণ্টকমুক্ত করার পাশাপাশি বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি দূর করা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়দায়িত্ব যাদের, সেই আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সবার দায়বদ্ধতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

নৈতিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের ধস ঠেকাতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে জাগরণ ঘটানোও সমভাবেই জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকাঠামোর আরো বলিষ্ঠতা ও একই সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে শিক্ষা পাঠ্যক্রমে নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো আরো বেশি পঠনযোগ্য ও সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে নীতিনির্ধারকদের আরো মনোযোগ বৃদ্ধিরও বিকল্প নেই। পারিবারিক ক্ষেত্রে প্রত্যেকের আরো বাড়তি নজর দেওয়ার পাশাপাশি বন্ধনের গ্রন্থিগুলো মজবুত করতেই হবে। স্বীকার তো করতেই হবে যে, সব শিক্ষালয়ের আগে বড় শিক্ষালয় হিসেবে পরিবারই বিবেচিত। কাজেই সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পরিবারের সব অন্ধকার দূর করার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক শুদ্ধতা নিশ্চিত করা, সমাজ বিনির্মাণের অঙ্গীকার-প্রত্যয়ও দৃঢ় করতেই হবে। সব রকম স্ববিরোধিতা বর্জন করে জনকল্যাণের রাজনীতিতে নিজেদের সেভাবেই নিবেদিত করে রাজনীতির যে সংজ্ঞাসূত্র, এর নিষ্ঠ প্রতিপালক তো তাদেরই হতে হবে। উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি নয়, এই সমাজের জনগোষ্ঠী বিরাজমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য যে হাঁসফাঁস করছে, তাদের পাশে রাষ্ট্র-সরকার-প্রশাসন ও রাজনীতিক সবার হাত একত্রে হোক মুষ্টিবদ্ধ।

n লেখক :নিবন্ধকার