অপেক্ষা

আমরা আছি, দেখতে পান আর না পান।

আমরা থাকতে চাই, বুঝতে চান আর না চান।

প্রথমে ছিলাম জঙ্গলে, যারা চারপায়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলে আর যারা ডানায় ভর করে অন্ধকারে আকাশে ওড়ে, তাদের সঙ্গে। তারপর কী করে যেন মাটিতে সোজা হয়ে চলা দুপেয়েদের মধ্যে চলে এলাম। গণ্ডগোলই বলুন আর লড়াইই বলুন, ব্যাপারটার সেখানেই শুরু।

প্রথমদিকে আমরাই জিতছিলাম। তারা আমাদের চিনত না, জানত না আমরা কীভাবে ছড়াই। ছড়িয়ে পড়াটাও সহজ ছিল। তারা মিনিটে অনেকবার ভেতরে বাতাস নেয়, আবার অনেকবার সেটা ছাড়ে। বাতাস নেবার সময় ঢুকে পড়ি, ভেতরে গিয়ে নিজেদের সংখ্যা বাড়াতে থাকি। আমাদের নতুন সদস্যরা ছেড়ে দেওয়া বাতাসের সঙ্গে বাইরে উড়ে যায়, নতুন কারো শরীরে আশ্রয় নেয়। আমরা কী করে ছড়াই জানত না বলে তারা কাছাকাছি বসত, মুখোমুখি দাঁড়াত আর কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে আসত। আমরা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিলাম। এমনিভাবে আমি এই বুড়ো দুপেয়েটার ভেতর ঢুকে পড়েছিলাম।

আমি যেখানটায় ঢুকলাম সেটা হাঁপরের মতো ওঠা-নামা করে। ফুললে ভেতরে বাতাস ঢুকে, আর চুপসে যাওয়ার সময় বের হয়ে যায়। তাতে অনেক অনেক কুঠুরি। আপনাদের কাছে সেগুলো খালি চোখে দেখেন না এমন ছোটো হলেও আমাদের কাছে বেশ বড় জুতসই ঘর। দেয়ালগুলো তেলতেলে, পিচ্ছিল। সেই চর্বিমাখা দেয়াল ধরে সহজেই ভেতরে ঢুকে গেলাম। সুন্দর, উষ্ণ একটা পরিবেশ। কয়েকজন পাহারাদার তেড়ে এল বটে, কিন্তু বুড়ো দুপেয়েটার মতো তারাও দুর্বল ছিল। আমার সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারল না। আমি আস্তানা গাড়লাম আর বিভাজিত হতে থাকলাম। আমার শরীর থেকে আরেকটা আমি বের হয়ে এল। তারপর আমাদের দুজনের শরীর থেকে আরো দুটো। এক থেকে দুই, দুই থেকে চার, চার থেকে আট এভাবে কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা সবকটা কুঠুরি ভরে ফেললাম। এবং সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলাম অন্যান্য অংশে।

বুড়ো দুপেয়েটা খুব কাশছিল আর হাঁসফাঁস করছিল। কী যেন চাচ্ছে কিন্তু কিছুতেই পাচ্ছে না। বুঝতে পারছিলাম যে দুপেয়েটার ভেতরে আগের মতো বাতাস ঢুকছে না। বাতাস না পেলে, অন্য দুপেয়েদের যা হয়েছে এরও তা-ই হবে। নড়াচড়া থেমে যাবে আর ঠান্ডা হয়ে যাবে। আমরা ভেতরে আটকা পড়ে যাব।

তারও বিপদ, আমাদেরও বিপদ।

কিন্তু আমরা এমনটা চাই না। শুরুতেই বলেছিলাম, আমরা টিকে থাকতে চাই। সেটা সহজ নয়। দুপেয়েদের শরীরে ঢুকলে হয় তাদের দারোয়ানরা আমাদের মেরে ফেলছে অথবা তারা নিজেরা চুপচাপ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে আমরাও। বুঝতে পারছি যে আমাদের রূপ বদলাতে হবে। উড়ে চলাদের সঙ্গে যেমন আমাদের মিলমিশ হয়ে গেছে, কেউ কারও ক্ষতি না করেই টিকে আছি, মাটিতে হাঁটা দুপেয়েদের বেলায়ও তা-ই করতে হবে। কিন্তু তার জন্য সময় লাগবে, আমাদের হিসেবে অন্তত কয়েক জনম লাগবে সেটা ঘটতে।

কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছি, এ দুপেয়েটার অত সময় নেই। যেকোনো সময় এ ঠান্ডা মেরে যাবে। তার আগেই আমাকে বের হয়ে যেতে হবে। আমাদের অনেকে আগেই বের হয়ে গেছে, অবশ্যি তারা কোথাও পৌঁছুতে পেরেছে কি না জানি না।

দুপেয়েটাকে একটা কমবয়সী দুপেয়ে তাদের বাড়ি থেকে আরেকটা বড়ো বাড়িতে নিয়ে এসেছে। মস্ত বড়ো দালানের বারান্দায় মাটিতে শুইয়ে রেখেছে। অল্প-বয়সী দুপেয়েটা তাকে ভিতরে নিয়ে যাবার জন্য কাকুতিমিনতি করছিল, কিন্তু বড়ো দালানের লোকজন রাজি হয়নি। ভেতরে নাকি জায়গা খালি নেই, সব দুপেয়েতে ভর্তি। ছোটো দুপেয়েটা যেভাবে সেবা-যত্ন করছিল তাতে মনে হয় ও বুড়োটার শরীর ভাগ হয়ে বের হয়ে এসেছে। সে খালি ‘বাবা’ ‘বাবা’ করছিল আর তার কথা শুনতে পাচ্ছে কি না জিজ্ঞেস করছিল। কিন্তু বুড়ো দুপেয়েটা ঝিম মেরে পড়েছিল। কথা বলার মতো অবস্থা তার ছিল না।

বাতাস খুব কমে এসেছিল। আর দেরি হলে আটকা পড়ে যেতে পারি। এতটুকু বাতাসে উড়েই বের হয়ে এলাম। আমরা তো ওজনে হালকা। অতি সামান্য হাওয়াতেই ভেসে বেড়াতে পারি। বের হতে হতে দেখলাম বুড়োটার বাতাস আসা-যাওয়ার পথে কী একটা নল লাগিয়েছে। ঢুকবার সময় সেটা দেখিনি।

দুপেয়েটার ভেতর থেকে বের হতেই আরেকটা বাতাস আমাকে টানল। কমবয়সী দুপেয়েটা কাছেই ছিল। সে-ই নিজের দিকে বাতাস টানছে। যাক বেঁচে গেলাম। ভাগ্য ভালো, আরেক দুপেয়ের ভেতরে ঢুকতে পারব। বেঁচে থাকার আনন্দই আলাদা, হোক না সে কয়েকটা দিনমাত্র।

এই যাহ্! একটা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আমার সুখ-স্বপ্ন ভেঙে গেল। দুপেয়েটার বাতাস ঢোকা-বের হবার রাস্তাটা ঘেরাও দিয়ে রেখেছে। জিনিসটা আগেও দেখেছি। এটা থাকলে আমরা ঢুকতে পারি না, বের হওয়াও কঠিন হয়ে যায়। দুপেয়েরা কিছুক্ষণ পরপর এটা বদলে ফেলে। এর গায়ে লেগে থাকলে একটু পরেই ময়লা ফেলার বাক্সে ঢুকতে হবে। যে জিনিসটা আমাদের সবচেয়ে বড়ো শত্রু, যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না কিন্তু যা চারদিক ফর্সা করে ফেলে আর আমাদের শরীরকে গরম দিয়ে নষ্ট করে দেয়, সে জিনিসটার ছোঁয়াও এখন টের পাচ্ছি। ওটা আমার গায়ের তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখানে থাকা যাবে না কিছুতেই। আমি সকল শক্তি দিয়ে ঝাঁপ দিলাম। যেখানটায় এসে পড়লাম সেটা কমবয়সী দুপেয়েটার হাতের উল্টোপিঠ। যা বুঝতে পারছি বাতাস ঢোকার পথের ঘেরাও টপকে আমি সহজে এ দুপেয়ের ভেতরে ঢুকতে পারব না। অন্য কোনো পথ বের করতে হবে। নতুন জায়গাটায় অপেক্ষা করতে অসুবিধে নেই। এখানে সেই আগুনে জিনিসটা নেই, বরং একটা ছায়া ছায়া ভাব।

কমবয়সী দুপেয়েটার কাছে বড়ো দালান থেকে একটা লোক এল। তার সারা গা ঢাকা। কেমন একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব। সে একটা কাগজ এগিয়ে দিল।

‘সরি ভাই, পজিটিভ।’

‘হায় খোদা!’

কমবয়সী দুপেয়েটা একটা লাফ মেরে বুড়ো দুপেয়েটার কাছ থেকে সরে এল। ভাগ্যিস তার হাতে কামড় মেরে আটকেছিলাম, নইলে ঝাঁকুনিতে পড়েই যেতাম।

বড়ো দালানের লোকটা চলে গেল। ছোট দুপেয়েটা বেশ খানিকটা দূরে এসে বুড়োটার দিকে তাকিয়ে থাকল। চোখে ভয় আর বেদনা। আমি ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি। ভাব দেখে মনে হচ্ছে বুড়ো দুপেয়েটা এখনই ঠান্ডা হয়ে যাবে। এদের কেউ ঠান্ডা হয়ে গেলে অন্য দুপেয়েরা খুব কান্নাকাটি করে। অল্প বয়সী দুপেয়েটাও এখন কাঁদবে। বুড়ো দুপেয়েটা ঠান্ডা হয়ে যাবে বলে নয়, সে কাঁদবে তার কাছে থাকতে পারছে না বলে। ওর চোখ দিয়ে দরদর করে পানি ঝরবে, কিন্তু কোনো আওয়াজ বের হবে না। তারপর সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছবে।

সেটাই হবে আমার সময়।