বিচিত্র পেশার নারী

পলাশ রায়

 

‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ আজকের আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ তেমন একটা চোখে পড়ে না। পরিবার থেকে রাষ্ট্রে নারীর অংশগ্রহণ উন্নয়নকে দিনদিন তরান্বিত করছে। তবে সমাজের কিছু কিছু কাজ বা পেশায় এখনো নারীদের সচরাচর দেখা যায় না। সামাজিক বাঁধা নিষেধ না থাকলেও নারীর জন্য স্বাচ্ছন্দ্য নয় বলে সেসব পেশা থেকে দূরে থাকছেন নিজে থেকেই। তবে কেউ কেউ জীবন জীবিকার সংগ্রামে বেছে নিয়েছেন এমন বিচিত্র পেশা। সংসারের সীমাহীন দারিদ্রে ঝালকাঠির এমন এক নারী আজ গ্রামের হাটে মুচির কাজে খুঁজে নিয়েছেন জীবন জীবিকা।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের চামটা গ্রাম। কবি কামিনী রায়ের বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে শান্ত নদীটি। আর তার পাশেই বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছিলেন ঋষি ( মুচি) সতীশ চন্দ্র লাল দাস। বছর ১৫ আগে সতীশ ও তার স্ত্রী পরলোক গমন করেন। কিন্তু সীমাহীন দারিদ্রের সংসারে রেখে যান তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে। গ্রামের ওই ঋষি বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে তাদের চরম দুর্দশার করুণ দৃশ্য। ভাঙা ঘর তার ওপর খুঁটি আলগা হয়ে যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার শঙ্কা। আর তার ভেতরই গাদাগাদি করে প্রয়াত ঋষি সতীশের বড় ছেলে রবিন দাস তার স্ত্রী, শিশু পুত্র ও তিন বোনকে নিয়ে থাকছেন। দুই বোনের বিয়ে হলেও তাদেরও ঠাঁই হয়েছে বাপের বাড়িতেই। ছোট মেয়ে সবিতা রানি দাস। তাকে নিয়েই এ জীবন্ত গল্প—

প্রয়াত ঋষি সতীশের বড় ছেলে রবিন জানান, স্বাধীনতার পর স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল তাদের জমিজমা দখল করে নয়। এখন রাস্তার পাশে ৫ শতাংশ জমিতে কোনোমতে খুপরি ঘরে তাদের বসবাস। অনুষ্ঠান আয়োজনে মাংস কাটার (কষাই) কাজ করে আর চামড়া সংগ্রহ করে তা বিক্রির টাকায় কোনোমতে সংসার চলছে। তার ওপর দুই বোনকেও দেখতে হয়। তবে সবিতা নিজেই নিজের খরচ চালান। বাড়ির পাশেই বাউকাঠি হাট। আর হাটের পাশেই নবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়। সেখানেই সবিতার মুচির দোকানের ঠাঁই হয়েছে।  পুরোনো ছেঁড়া জুতা-স্যান্ডেল মেরামত করে সবিতার জীবিকা চলছে।

সবিতার ভাবি সীমা রানি দাস জানান, বয়স ২৫ পেড়িয়ে গেলেও ননদকে বিয়ে দিতে পারছেন না টাকার অভাবে। ছেলেপক্ষ নগদ টাকাসহ জিনিসপত্রের দাবি করলে বিয়ে ভেঙে যায় বারবার। অভাবের সংসারে খাওয়া-পরাই দায়। সেখানে খরচ করে বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না তারা। তার ওপর বাজারে মুচির কাজ করায় ভালো ছেলেও পাওয়া যাচ্ছে না।

সেদিন ভরদুপুরে সবিতাদের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় সবিতাসহ পরিবারের অন্যান্যদের সাথে। ফুটপাতের দোকান বন্ধ করে তখন সবেমাত্র সাবিতা বাড়ি ফিরেছেন। রান্না বসিয়ে চুলোর পাশেই পিঁড়িতে বসতে দিলেন আমাকে। কেন এ পেশায় জীবন বেছে নিয়েছেন জানতে চাইলে সবিতা বলেন, ‘বাবা-মা মারা যাওয়ার পর ভাইয়ের সংসারে সীমাহীন অভাব দেখা দেয়। তখন বাধ্য হয়ে কাজে নামতে হয়েছে।’ বাড়ি বাড়ি শ্রমিকের কাজ না করে বাপ-দাদার কাছে শেখা মুচির কাজকেই জীবিকার জন্য বেছে নিয়েছেন জানিয়ে সবিতা বলেন, ‘যত ছোটই হোক কাজ করে খাই, চুরি করি না।’ অন্য কাজের চেয়ে এ কাজ তার কাছে স্বাচ্ছন্দ্যের মনে হয়, আর এতদিনে কোনো প্রকার সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়নি জানান এ নারী।

হার না মানা এ নারীকে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হকও ভালো করেই চেনেন। সবিতার ব্যাপারে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘তাকে এরইমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক ভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে। সবিতাসহ জেলার সকল মুচি ব্যবসায়ীকে আধুনিক করার জন্য সাবাইকে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ ছাতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আর সবিতার ভাগ্য উন্নয়নে তাকে আরো সাহায্য সহযোগিতা করারও পরিকল্পনা রয়েছে।’

দেখতে দেখতে গত ৮ বছরে নিজেকে একজন দক্ষ কারিগর হিসেবে তৈরি করছেন সবিতা। হাট ছাড়াও তার বাড়িতে প্রতিবেশীরা ছেঁড়া স্যান্ডেল সারাতে আসেন। তবে এ পেশায় এখন ভবিষ্যত্ নেই জানিয়ে সবিতা বলেন, ‘এখন আর ছেঁড়া জুতা সারাতে লোকজন বেশি আসে না। এখন কম দামে বাজারে অনেক জুতা-স্যান্ডেল পাওয়া যায়।’ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সবিতা আরো বলেন, ‘বাজারে একটা নতুন জুতা-স্যান্ডেলের দোকানের পাশাপাশি মুচির ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারলে ভাগ্যের পরিবর্তন হতো।’