দিনাজপুরের মরা ইছামতি নদী

অনাদিকাল যাবত্ চিরিরবন্দর আত্রাই নদী থেকে আগত আখিরাডাড়া খাল ফুলপুর মোহনায় ভাগ হয়ে যথাক্রমে পূর্বদিকে জসাইহাটের দিকে ছোট যমুনা নদী নামে এবং দক্ষিণ দিকে ইছামতি নদী নামে প্রবাহিত। ইছামতি নদী ফুলপুর মোহনা থেকে কুতুবডাঙ্গার হাট, আমবাড়ীহাট, জলপাইতলীহাট, রুদ্রানীহাট ও ভেড়ম গ্রাম হয়ে ভারতের ইনাতুল্লাপুর গ্রামে প্রবেশ করেছে। এই নদীর গতিপথ ভারতের প্রবেশমুখ পর্যন্ত প্রায় ৮০-৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য; যা চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী উপজেলাসমূহের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের আগ পর্যন্ত বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার নদীগুলোতে পানি প্রবাহমান ছিল। কিন্তু এরপর জেলার উজানে ভারতীয় অংশে নদীগুলোয় বাঁধ নির্মাণের ফলে ভাটি অংশে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার নদীগুলো খরা মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে মিশে গিয়েছে সমতল ফসলি জমির সঙ্গে। কোনো কোনো নদীর চিহ্ন পর্যন্ত নাই। ইছামতি নদীর বর্তমান চিত্র প্রদত্ত ছবিতে দেখা যাচ্ছে (আমবাড়ীহাট পয়েন্টে)। নদী তীরবর্তী বসতকারগণ নদীর বুকে বিভিন্ন ফসল যে যার মতো দখল করে আবাদ করছে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে গঙ্গা ও তিস্তাসহ দুই দেশের অভিন্ন ৫৪টি নদনদীর প্রবাহ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সাগরে গিয়ে পড়ে। কিন্তু প্রতিবেশী ভারত একতরফাভাবে নদীগুলোর প্রবেশমুখে বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে মরূকরণ শুরু হয়েছে। গঙ্গা নদের ওপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারায় জি কে প্রজেক্ট এবং তিস্তা নদে বাঁধ নির্মাণের ফলে লালমনিরহাট জেলার তিস্তা ব্যারেজ প্রজেক্ট অকার্যকর হওয়ায় দেশে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশের মানবতাবাদী, দূরদর্শী ও দেশ উন্নয়নে নিবেদিত জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হতোদ্যম না হয়ে বর্ষার পানি এবং বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠু ব্যবহার করার জন্য ‘ভিশন-২১০০’ অনুযায়ী সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ২০১১ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারকে ‘শতবর্ষী-২১০০ ডেলটা প্ল্যান’ প্রণয়নের অনুরোধ করা হয়। নেদারল্যান্ডস সরকার ২০১৪ সালে ‘শতবর্ষী-২১০০ ডেলটা প্ল্যান’ প্রণয়ন করে, যা পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (এনইসি) অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশের সব জেলায় ‘ডেলটা প্লান’ প্রকল্প ভিত্তিক পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ের কাজ ইতিমধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শুরু করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানিসম্পদের সুষম ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনগণের জীবন ও জীবিকার জন্য পানির চাহিদা পূরণ এবং টেকসই উন্নয়ন, পুনঃখননের মাধ্যমে ছোট নদী, খাল, জলাশয়গুলো পুনরুজ্জীবিতকরণ ও পানির ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সেচ সুবিধা নিশ্চিতকরণ, মত্স্য চাষের উন্নয়ন, নদীর উভয় তীরে ও জলাধার পাড়ে বনায়ন সৃষ্টি, পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সাধন করার লক্ষ্যেই ‘ডেলটা প্লান’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

তাই জনস্বার্থে ডেলটা প্লানের অধীনে প্রকল্প ভিত্তিক ‘মরা ইছামতি নদী খনন’ কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করার জন্য দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ, দিনাজপুর-৪ সংসদীয় এলাকার সংসদ সদস্য, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ এইচ মাহমুদ আলী এবং দিনাজপুর-৫ সংসদীয় এলাকার সংসদ সদস্য, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান এবং বাংলাদেশ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

দিনাজপুর