এখনকার ওটিটি প্লাটফর্মের ওয়েব সিরিজগুলোয় বাজেট বেশি থাকে। নির্মাতারা তাদের নিজের ভাবনার মতো করেই নির্মাণটা করতে পারেন। তাই এই সেক্টরটাকে ভীষণ সম্ভাবনাময় দেখছি।
তানভীর তারেক
সিনেমার বিকল্প কী হতে যাচ্ছে ওয়েব সিরিজ? এমন প্রশ্ন এখন অনেকের ভেতরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। সর্বশেষ একটি ওটিটি প্লাটফর্মে মুক্তি পাওয়া চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত ‘তাকদ্বীর’ সিরিজটিও প্রাথমিক আলোচনায় একটি চলচ্চিত্রই হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত বদলে ওয়েব সিরিজ হিসেবে মুক্তি দেওয়া হয়। এর কারণ ছিল পুরো প্রযোজনার লগ্নিটা উঠিয়ে আনা। অর্থাত্ লগ্নি তোলার জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মাধ্যমে ওয়েব সিরিজ। একই ধারাবাহিকতায় এখন অনেক চলচ্চিত্রের লগ্নিকারী ওয়েব সিরিজ বানানোর ব্যাপারে উত্সাহী হচ্ছেন। বিশ্বের একাধিক দেশে এখন একাধিক ফিল্ম স্টাররা সিনেমার পাশাপাশি ওটিটির সিরিজগুলোতে সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। সর্বশেষ প্রাইম অ্যামাজনের সিরিজ দ্য ফ্যামিলি ম্যান-এর আয় ব্লকবাস্টার ফিল্মের আয়কেও ছাড়িয়ে গেছে! ফ্যামিলি ম্যানের প্রধান তারকা মনোজ বাজপেয়ী নিজেই বলেছেন, সময় এখন ওয়েব সিরিজের। দর্শকরা এখন এখানেই ভালো কিছু দেখার অপেক্ষায় থাকে।
উল্লেখ্য, সালমান খানের ছবির প্রথম দুটি শোতেও মাত্র ৮৪ জন দর্শক হয়েছে। তার রাধে ছবিটির লগ্নি অনলাইন থেকেই উঠেছে সিংহভাগ।
সেদিক দিয়ে আমাদের দেশের হতাশার খবর হলো, এই ওটিটি ইন্ডাস্ট্রির দুনিয়ায় পপুলার ওটিটি প্লাটফর্ম এখনো গড়ে ওঠেনি। গুগলের নিজেস্ব ওটিটি প্লাটফর্ম অর্থাত্ ইউটিউবেই একাধিক নামে একাধিক প্রযোজক চ্যানেল গড়ে সেখানে নাটক টেলিফিল্ম পোস্ট দিচ্ছে। এতে নাটকের ইন্ডাস্ট্রি টিভি নামের বোকাবাক্স থেকে বেরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেভাবে পেশাদারিত্ব বা প্রতিযোগিতার জায়গায় দাঁড়ায়নি। ফলে যে যার মতো ইউটিউব চ্যানেলে তাদের লগ্নিকৃত নাটক বা টেলিফিল্ম প্রকাশ করছে। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র টাকা ইনকামের নেশাতেই এ সকল প্রযোজকরা ছুটছেন যাদের ভিউ বেশি সেইসব গুটিকতক তারকাদের কাছে। ফলে হাতেগোনা দু-চার জন তারকা মাসের ৩০ দিন বিক্রি করে দিচ্ছেন একাধিক প্রডাকশনের জন্য। বাকি অধিকাংশ গুণী অভিনেতা ভুগছেন হাহাকার হতাশায়। আর এই অনিয়ন্ত্রিত ইন্ডাস্ট্রিতে যখন ভিউটাই সর্বাধিক প্রত্যাশার জায়গায় থাকে, তাই সেখানে ঢুকছে অযাচিত অশ্লীল সংলাপ, ডাবল মিনিং শব্দের নামে দর্শকদের সুড়সুড়ি দেওয়া ও কদার্য দৃশ্যায়ন। আর ‘চরিত্রের প্রয়োজনে’ দোহাই দিয়ে অনেকেই এই বিষয়টি জায়েজ করছেন। অন্যদিকে নান্দনিক নির্মাতারা ভয় পাচ্ছেন বা নিজের দেশের ওটিটিকে দুর্বল বা আস্থার জায়গায় রাখতে পারছেন না। ফলে বাইরের দেশে বিশেষ করে কলকাতার কয়েকটি ওটিটি প্লাটফর্মে এখন আমাদের দেশের নির্মাতা ও অভিনেতারা ক্রমেই চাহিদাসম্পন্ন হয়ে উঠছেন।
এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি জি ফাইভে মুক্তি পাওয়া ‘মহানগর’ সিরিজের নির্মাতা আশফাক নিপুন বলেন, ‘আমাদের দেশে কাজ করতে গেলে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। আমি চাইলেও অনেককিছু দেখাতে পারবো না। আর পারলেও আমাকে বিতর্কের ভেতরে পড়তে হবে। তাই আমি মনে করি, এই বিষয়গুলো যতদিন স্পষ্টভাবে সুরাহা না হবে ততদিন এই পুরোদস্তুর পেশাদার ওটিটি দাঁড়াবে না।’ অন্যদিকে ক্যারিয়ারে যে ক’টি ছবি করেছেন তার প্রতিটিতেই সফল হয়েছেন চঞ্চল চৌধুরী। এই গুণী অভিনেতাও এখন ওটিটিকে মানসম্পন্ন প্রডাকশনের মাধ্যমে নিজের অভিনয়শৈলী দেখানোর প্লাটফর্ম মনে করছেন। চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘এখনকার ওটিটি প্লাটফর্মের ওয়েব সিরিজগুলোয় বাজেট বেশি থাকে। নির্মাতারা তাদের নিজের ভাবনার মতো করেই নির্মাণটা করতে পারেন। তাই এই সেক্টরটাকে ভীষণ সম্ভাবনাময় দেখছি।’
উল্লেখ্য, সিনেমা হলের ভাবনায় এখন যেমন সিনেমা করলে হবে না। তেমনই ওটিটি প্লাটফর্মের ক্ষেত্রে আমাদের আরো অগ্রসর হওয়াটা খুব জরুরি। দেশের জনপ্রিয় নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে হবে। তা না হলে বিশ্ববাজারে আমরা পিছিয়ে থাকবো। আমাদের আর্টিস্ট নিয়ে অন্যরা বিজনেস করতে থাকবে।’ এই অবস্থায় একদিকে যেমন অশ্লীল ডায়লগে ভরা নাটককে থামানো যাচ্ছে না তেমনি এসব কদার্যতার ভিড়ে যারা নান্দনিকভাবে মানসম্পন্ন প্রডাকশন তৈরি করতে চান তারা নিজের দেশের প্লাটফর্মকে ভয় পাচ্ছেন। এই উভয় সংকট থেকে উত্রানোর কী উপায় তা নিয়ে এখনই না ভাবলে এক সময় শুধু গুটিকতক ভিউ গোনা তারকারাই কাজ করবে। বাকিদের হতাশায় ডুববে ইন্ডাস্ট্রি!