দেশের উন্নয়নে চাই মাদকমুক্ত সমাজ

বাংলাদেশ মাদক উত্পাদনকারী দেশ নহে; কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাদকের সর্বাত্মক আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হইয়াছে। মাদকের স্বর্গরাজ্য গোল্ডেন ক্রিসেন্ট আমাদের দেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এবং আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য উত্পাদনকারী অঞ্চল মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সমন্বয়ে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত আমাদের দেশ। এই সকল দেশ হইতে আন্তর্জাতিকভাবে মাদক পাচারের জন্য আমাদের দেশকে ট্রানজিট রুট হিসাবে ব্যবহার করা হইতেছে। এই জন্য মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ ও সকল বাহিনীর একসঙ্গে কাজ করিবার পরও মাদকের বিস্তার রোধ করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত ২৬ জুন সমগ্র বিশ্বে পালিত হইল ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর মানুষের মধ্যে নানান কারণে হতাশা বাড়িয়াছে। আইসোলেশনে থাকায় একাকীত্ব, অর্থনৈতিক মন্দায় চাকুরিচ্যুতি, বেকারত্ব ইত্যাদি কারণে বাড়িয়াছে মানুষের মানসিক বৈকল্য ও সমস্যা। ইহাতেও পূর্বের তুলনায় মাদকাসক্তি কমে নাই, বরং বাড়িয়াছে বইকি।

উন্নত বিশ্বে মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিত্সা ব্যয়ভার সরকার নিজেই বহন করিয়া থাকে। পক্ষান্তরে আমাদের এখানে মাদকাসক্তির চিকিত্সাব্যবস্থা সুলভ নহে। অনেক সময় এই অভিযোগও করা হইয়া থাকে যে, সরকারি-বেসরকারি মাদক নিরাময়কেন্দ্রগুলি মাদক নিরাময়ের বদলে মাদক বিস্তারের কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহূত হইতেছে। সেখানে মাদকসেবীদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চালাইবার অভিযোগও রহিয়াছে। উন্নত দেশসমূহ মাদকের প্রতিরোধ ও নিরাময়ে নানা বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এই জন্য সরকার জোর গলায় তাহার নাগরিকদের মাদক গ্রহণে নিষেধ করিতে পারেন। এই অধিকার সরকারের রহিয়াছে; কিন্তু আমরা যেহেতু মাদকসেবীদের সুস্থ করিয়া তুলিবার ব্যাপারে তেমন দায়িত্বশীল নই, তাই আমাদের কি এই অধিকার রহিয়াছে? জনহিতৈষী রাজা-বাদশাহগণ ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া প্রজাগণের দ্বারে দ্বারে যাইয়া তাহাদের খোঁজখবর রাখিতেন। তাহাদের সমস্যার তাত্ক্ষণিক সমাধান করিতেন; কিন্তু পথেঘাটে, বাজারে পড়িয়া থাকা কয়জন ছিন্নমূল মাদকসেবীর পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছি আমরা? এই প্রশ্ন তোলাটাও আজ অবান্তর হইবে না।

উল্লেখ্য, যেহেতু আমরা উন্নয়নশীল দেশ, তাই সকল উন্নয়নের ক্ষেত্রে ২০, ৫০ এমনকি ১০০ বত্সরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাদকাসক্তি নিরাময় ও নির্মূলের ক্ষেত্রেও আমাদের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা উচিত। প্রচলিত মাদক তথা গাঁজা, ফেনসিডিল, চরস, ভাং, গুল, জর্দা, হেরোইন, প্যাথেড্রিন, মদ, ইয়াবার পাশাপাশি আজকাল ক্রিস্টাল মেথ বা আইস ও এলএসডির (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাই-ইথ্যালামাইড) ব্যবহারও বাড়িতেছে যাহা কম বিপজ্জনক নহে। মাদক জনস্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলিয়া থাকে। ইহার কারণে উদ্বেগজনকভাবে বাড়িতেছে পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতা। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ মাদকাসক্ত। বেকার ও তরুণ যুবসমাজের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত। মাদকের বিষাক্ত ছোবল ধ্বংস করিয়া দিতেছে তারুণ্যের শক্তি ও সম্ভাবনা। তাহাদের বাদ দিয়া দেশের উন্নয়নের কথা চিন্তা করা যায় না। অতএব, পরিবার, সমাজ ও সমগ্র জাতিকে রক্ষায় মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখিতে হইবে। চাহিদা, সরবরাহ ও ক্ষতি হ্রাস এবং জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে হইলেও দেশকে মাদকমুক্ত করিতে হইবে।