করোনা ও দূরশিক্ষণ কী ভাবছেন আমাদের মায়েরা?

ফাহামিনা জাহান

কোভিডের আগে ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে অফিসে করতাম, নিশ্চিন্ত থাকতাম যে তার পড়াশোনাটা ভালোভাবেই হচ্ছে। কিন্তু কোভিডে আমি অফিসে আর ছেলে বাসায় অনলাইন ক্লাস করছে। তাতে পড়াশোনা কতটুকু হচ্ছে সেটা বুঝছি না।             করোনা অতিমারিতে বাচ্চাদের অনলাইন ক্লাস বিষয়ে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থীর মা কথাটি বলেন।

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় একজন মা জানেন, তার সন্তান একটি দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকবে দক্ষ শিক্ষকমণ্ডলীর তত্ত্বাবধানে। এই শিক্ষকমণ্ডলীই নিশ্চিত করবেন শিক্ষার্থী সঠিক সময়ে ক্লাসে উপস্থিত রয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলছেন, শিক্ষাগ্রহণ করছেন এবং এসবের সাপেক্ষে শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করবেন। অর্থাত্, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন শিক্ষাগ্রহণ নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের দায়িত্ব প্রধান। কিন্তু অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর যাবতীয় শিক্ষা কার্যক্রম যেহেতু শিক্ষকগণের সরাসরি তত্ত্বাবধান ব্যতীত অনলাইনেই সম্পন্ন হয়, তাই এক্ষেত্রে অভিভাবকদের, মূলত মায়েদের দায়িত্ব প্রধান হয়ে উঠে এবং তারা এই পরিবর্তিত দায়িত্বকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। বিশেষত কর্মজীবী মায়েরা এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছেন।

অনলাইন ক্লাসের কারণে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় কম্পিউটার-মোবাইল ফোনের সামনে কাটাতে হচ্ছে, ক্লাসের স্বাভাবিক সময়ের বাইরে ক্লাস হচ্ছে, পড়াশোনা এসাইনমেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং সর্বোপরি, শিক্ষার্থীকে ন্যূনতম বা কোনো তত্ত্বাবধান ব্যতীত পড়াশোনা সম্পন্ন করতে হচ্ছে বলে অভিভাবকরা মনে করছেন। তারা আরো মনে করছেন অনলাইন ক্লাস শিক্ষার্থীদের নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অনভ্যস্ত, ঘরকুণে এবং কম্পিউটার-মোবাইল ফোনে আসক্ত করে তুলছে, যার ফলে করোনা পরবর্তী জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাদের অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে। এই প্রসঙ্গে একজন মা বলেন, ‘স্কুল মানে তো শুধু সিলেবাস শেষ করা নয়, স্কুলে আরো অনেক কিছু শেখার আছে। সিলেবাসটা অনলাইনে শেষ হলো, সেগুলো শিখবে কোথায়?’ এই বাস্তবতায় মায়েরা অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি এই অতিমারীতে শিক্ষাব্যবস্থাকে চলমান রাখতে অনলাইন ক্লাসের ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং এর অনেক সুবিধাও রয়েছে। প্রথমত, অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে এবং দক্ষভাবে ব্যবহার করতে শিখছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জীবনে সুফল বয়ে আনবে। দ্বিতীয়ত, কোচিং-প্রাইভেট নির্ভর পড়াশোনার কারণে সৃজনশীল পড়াশোনার পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাচ্ছিল না, যা অনলাইন ক্লাসের ফলে অনেকখানি কাটিয়ে উঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ত, শিশুরা শিক্ষাগ্রহণে স্বনির্ভর হওয়ার শিক্ষা পাচ্ছে, যা ভবিষ্যত্ জীবনে তাদের সাহায্য করবে। এছাড়াও, সন্তানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে অভিভাবকের সম্পৃক্ততা নিবিড় হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আরেক জন মা বলেন, ‘এখন অনলাইন ক্লাসের কারণে ওরা (তার সন্তানেরা) বাসায় থেকেই ক্লাস করে, শিক্ষকদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়, আমি এখন জানি ওরা কি পড়ছে, কোথায় কার দুর্বলতা। আগে তো বার্ষিক ফলাফল ছাড়া ওদের পড়াশোনার অবস্থা বোঝার উপায় ছিল না।’

করোনা-পূর্ববর্তী সময়ের একটি অতিপরিচিত চিত্র হচ্ছে মা তার সন্তানকে স্কুলে নিয়ে আসছেন এবং ক্লাস শেষে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, যা করোনা অতিমারি এবং অনলাইন ক্লাসের ফলে এখন বিলুপ্ত। নানান সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অনলাইন ক্লাসের কারণেই এই অতিমারিতেও শিক্ষা কার্যক্রম থেমে নেই বরং অনেকটাই মসৃণভাবে এগিয়ে চলছে অভিভাবকদের, বিশেষত মায়েদের অনবদ্য ভূমিকায়। প্রতিষ্ঠানে যেয়ে শিক্ষাগ্রহণের প্রচলিত পদ্ধতির বিপরীতে অনলাইন ক্লাস প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার্থীর কাছে নিয়ে এসে পঠন-পাঠনের ক্ষেত্রে কাঠামোগত যে পরিবর্তন করেছে, তার প্রভাব সুদূর প্রসারী এবং করোনা পরবর্তী নব্যস্বাভাবিক জীবনকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।