বন্ধুত্বে গল্প শুরু, তারপরে বিশ্বজয়

  মাহবুব নাহিদ

 

শুরুটা বন্ধুত্বের গল্প দিয়ে। একসঙ্গে পড়াশোনা করা, একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, সবই যখন একসঙ্গে তাহলে তো একসঙ্গে একটা বিজয়ের গল্পও তৈরি করা যায়! একসঙ্গে এতটা পথ চলা, তাহলে একসঙ্গে একটা সাফল্যের দ্বারে পৌঁছানো কি খুবই কঠিন? ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হলে বসে করা সেই পরিকল্পনা যে এক দিন পুরো দেশের কাছে ইতিহাস হয়ে যাবে তা হয়তো মানসী আর সাকিয়া নিজেরাও জানতেন না। কর্মজীবনে দুই জনই ডাক্তার! দুই জনই বিসিএস ক্যাডার হিসেবে নিযুক্ত আছেন এখন। মানসী সাহা আছেন শরীয়তপুরে আর সাকিয়া হক টেকনাফে।

২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর তারা একটা পরিকল্পনা করেন। তারা ভাবেন যে নারীদের ভ্রমণ নিয়ে কিছু একটা করবেন। তখন তারা ফেসবুকে একটা গ্রুপ খুলে ফেলেন। হঠাত্ করে চিন্তা আর হুট করে বানিয়ে ফেলা সেই গ্রুপ এখন বাংলাদেশের একটা মাইলফলক। নারীদের ভ্রমণের জন্য ভ্রমণকন্যা গ্রুপের কথা কে না জানে? কিন্তু অনেকেই হয়তো জানে না এর পেছনের গল্পটা। গল্পটা আসলেই এমন সহজ এবং সরল ছিল। এমন এক আড্ডা থেকেই এক দারুণ চিন্তা এসেছে তাদের মাথায়। নারীদের দিয়ে ঘোরাঘুরি করেই শুধু ক্ষান্ত থাকেননি মানসী আর সাকিয়া। তারা দুই জন একসঙ্গে স্কুটি নিয়ে ঘুরে ফেলেছেন দেশের ৬৪টি জেলা, নাম দিয়েছিলেন নারীর চোখে বাংলাদেশ। এ যেন এক অলেখা কাব্য, এক জীবন্ত উপন্যাস। যার প্রত্যেকটি পরতে পরতে ছিল লড়াই, সংগ্রাম আর সব বাধা বিপত্তিকে ভেদ করে দুর্নিবার এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

২০১৭ সালের মার্চে তারা সারা দেশ ঘোরার এক অনন্য মিশন পরিকল্পনা করেন। যাত্রা শুরু করেন এপ্রিলেই। তাদের যেন কোনো কিছুতেই দেরি করার অবকাশ নেই, যেই ভাবনা সেই কাজ। তারা যেন ছুটেছেন রকেটের গতিতে। তারা কিন্তু শুধু ঘুরে বেড়াননি, তারা মেয়েদের যৌন স্বাস্থ্য, আত্মরক্ষা, দেশ, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই সফরে কাজ করেছেন। বিভিন্ন স্কুলে স্কুলে বাচ্চাদের এসব বিষয়ে ধারণা দিয়েছেন।

যাত্রাটায়ে খুব মধুর ছিল তা কিন্তু নয়। অনেক কাটখড় পেরিয়ে তাদের এই যাত্রা সফল করতে হয়েছে। তারা দুই জন দুইটা স্কুটিতে ছিলেন আর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সহযোগী ছিল তাদের। ২০১৯ সালের ৫ মে ঢাকার মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলে তারা এই অভূতপূর্ব যাত্রার সমাপ্তি টানেন।

গুটিগুটি পায়ে ভ্রমণকন্যা এখন অনেক দূর এগিয়েছে। তাদের কমিটির সদস্য সংখ্যা ২৫ জন, ১ হাজার ১০০ জন ভলান্টিয়ার আর ৫৯ হাজার মহিলা সদস্য রয়েছেন আর সঙ্গে রয়েছেন যেন সারা দেশের নারীরা। যারা একটু নীরবতার আড়াল ভেঙে একটু বেড়িয়ে দেশ ঘুরতে চান কিংবা চারপাশটাকে, দেশের প্রকৃতি পরিবেশের সুধা গায়ে মাখতে চান সেই মেয়েদের আশ্রয়স্থল হচ্ছে ভ্রমণকন্যা। তাদের প্রেরণার বাতিঘর মানসী সাহা আর সাকিয়া হক।

সামনে তাদের অনেক পরিকল্পনা, এগিয়ে যেতে চান অনেক দূরে। পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি এক পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছেন তারা। মেয়ে শিশুদের আত্মরক্ষাসহ নানান বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতি মাসে প্রতি বিভাগে দুইটি করে সারা দেশের ১৬টি স্কুলে কাজ করতে চান তারা। হয়তো একদিন মানসী আর সাকিয়ার দুর্দান্ত, দুরন্ত ইচ্ছাগুলো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে যাবে বিশ্বের দুয়ারে! উজ্জ্বল করবে বাংলাদেশের নাম, গর্বিত করবে প্রিয় লালসবুজের পতাকা।