পরিবর্তিত গ্রাম বাংলার চিত্র

গ্রাম বলতেই আমরা বুঝি সতেজতা, সরলতা আর মানবতাকে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি শান্তির নীড়। নিষ্কলঙ্ক মানুষের মনগুলো যেন দীঘির নীল জলে ভেসে ওঠা ফোটা পদ্মফুল। পঙ্কিলতামুক্ত গ্রামের সরু রাস্তা, টিনের চালে বৃষ্টির ঝিরিঝিরি শব্দ, ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ডাক, পাখির কলতান, রাতের রুপালি চাঁদ আর একটি স্রোতঃস্বিনী নদী। এ যেন শান্তি আর সম্প্রীতির হাটবাজার। ‘একটি স্বাস্থ্যকর নিঃশ্বাসের জন্য হলেও গ্রামে আসা দরকার’—খাঁচায় আবদ্ধ পাখির মতো করে শহরের চার দেওয়ালের মধ্যে বেড়ে ওঠা পরিচিত কতশত মানুষকে আমরা সগর্বে বলেছি তা অজানা। কিন্তু গ্রামের পরিবেশগুলো যে দিনে দিনে মানুষের জন্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে তার খবর আমরা কজন রাখি! বিষাক্ত দাবানল ক্রমশই গলাধঃকরণ করছে গ্রামের চিরাচরিত চরিত্রকে। আজ মনে কিছু প্রশ্ন দানা বেঁধেছে আমার গ্রাম, আমার জন্মস্থান যদি আমার জন্য নিরাপদ না হয়,  তাহলে আমি কীভাবে অন্য কাউকে স্বাস্থ্যকর পরিবেশের নিশ্চয়তা দেব? মহামারি করোনার সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনেকটা সময় গ্রামে কাটিয়েছি। অনেক মধুর স্মৃতির সঙ্গে জন্মেছে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতাও। গ্রামের মানুষের রূপ যে কতটা পরিবর্তিত তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানে! পলিটিকস শব্দটার প্রয়োগ ও ব্যবহার বিধি নিয়ে অনেক ধরনের মতভেদ থাকতে পারে। তবে, পলিটিকস শব্দটার সবচেয়ে অপমানজনক প্রয়োগ ও দূষণীয় ব্যবহার হয়েছে ‘ভিলেজ পলিটিকস’ বা ‘গ্রাম্য রাজনীতি’ শব্দগুচ্ছে।  ভিলেজ পলিটিকস কার্বন-ডাইঅক্সাইডের মতো এমনই এক বিষাক্ত গ্যাস যা মুহূর্তের মধ্যে একজন নিরপরাধ মানুষকেও দমবন্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি করে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন, প্রতিহিংসাপরায়ণ গ্রাম্য মাতাব্বরগণ নিজেদের আমেরিকার প্রেসিডেন্টের চেয়েও শক্তিধর ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভাবেন। তাদের ক্ষমতার ইয়ত্তা নেই! জবরদখল, জুলুম,  নির্যাতন, নিপীড়ন, মিথ্যা মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে নিরপরাধ মানুষকে শুধু বাকরুদ্ধই করে না, পেশিশক্তি দিয়ে মহাশূন্য বিজয়ের কল্পকাহিনি রটিয়েও তাদের নিজেদের প্রতাপের জানান দেওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা। সচেতনতা আর সুশিক্ষার বীজ অঙ্কুরে বিনষ্ট করে নিজের চাহিদামতো কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অপশক্তির অন্ধভক্তির রাজ্য বিনির্মাণে এরা এতোটাই বেপরোয়া যে, যে কোনো সুশিক্ষিত মানুষকে পথের কাঁটা ভাবতে এরা কুণ্ঠাবোধ করে না। সচেতন মানুষকে সংস্কারপন্থি হিসেবে আশঙ্কা করে পদে পদে অপমান-অপদস্থ করে বিপদে ফেলার চেষ্টা করে। এই কপটচারী গ্রাম্য-মাতব্বরদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে অনেকে সম্মানহানির ভয়ে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজ আবাসভূমি ছাড়তে পর্যন্ত বাধ্য হয় আর যারা রয়ে যায় তারা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধহীন হয়ে অন্যায় মুখ বুঝে সহ্য করে শুধু টিকে থাকে অথবা সন্ত্রাসীদের পদলেহন করে নিজেও বিপথগামিতার পথ বেছে নেয়। শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘বিলাসী’ গল্পে শিক্ষিত ভদ্রলোকদের পল্লিতে বসবাস না করাকে পল্লির দুর্দশার জন্য দায়ী করেছেন। আমার বিশ্বাস বর্তমান সময়ে তিনি বেঁচে থাকলে পল্লির দুর্দশার জন্য শুধু শিক্ষিত লোকের বসবাস না করাকে দায়ী করতেন না বরং সুস্থ মানুষের বসবাস করার অনুপযোগী পরিবেশকেও দায়ী করতেন।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী

বিশ্ববিদ্যালয়