কানে বাংলাদেশের ইতিহাসটা কেমন

কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশনে যেসব বিভাগ থাকে সেগুলোর মধ্যে পুরস্কার দেওয়া হয় দুটিতে। এর মধ্যে ‘কম্পিটিশন’ তথা মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে দেওয়া হয় সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন স্বীকৃতি পাম দ’র তথা স্বর্ণ পাম। 

মূল প্রতিযোগিতার ঠিক পরেই সম্মানজনক বিভাগ হলো ‘আঁ সার্তে রিগা’। মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের মতোই আঁ সার্তে রিগায় সেরা চলচ্চিত্র, অভিনয়শিল্পী, পরিচালকসহ নানান পুরস্কার প্রদান করে আয়োজকরা। কানের ৭৪তম আসরে বাংলাদেশের আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ পরিচালিত ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ জায়গা করে নিয়েছে বিভাগটিতে। এর মাধ্যমে কানে অফিসিয়াল সিলেকশনের খাতা খুললো বাংলাদেশ।

অফিসিয়াল সিলেকশনে আউট অব কম্পিটিশন (প্রতিযোগিতার বাইরে) হিসেবে থাকে স্পেশাল স্ক্রিনিংস, মিডনাইট স্ক্রিনিংস এবং কান প্রিমিয়ার। এসব বিভাগে বিখ্যাত রথি-মহারথি নির্মাতাদের ছবি দেখানো হয়। তবে কোনো পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই। আয়োজকরা এই বিভাগগুলোতে নেটফ্লিক্সকে স্বাগত জানাতে চায়, কিন্তু প্রতিযোগিতা নয় বলে নেটফ্লিক্স আগ্রহ দেখায় না। 

কানে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগেও দেওয়া হয় স্বর্ণ পাম। কিন্তু এটি অফিসিয়াল সিলেকশন নয়! শিক্ষার্থীদের বানানো ছবির বিভাগ সিনেফঁদাসোতে পুরস্কার প্রদান করে থাকে আয়োজকরা। এটাও অফিসিয়াল সিলেকশনের আওতায় পড়ে না। কান ক্ল্যাসিকসে দেখানো হয় প্রথিতযশা নির্মাতাদের ধ্রুপদী ছবি। এটাকেও অফিসিয়াল সিলেকশন বলা হয় না। 

কান উৎসবের আয়োজকরা বাইরের তিনটি সংগঠনের আয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। তাই এগুলো প্যারালাল বিভাগ। এর মধ্যে ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইট অন্যতম। ২০০২ সালে এতে স্থান পায় তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। তার হাত ধরেই কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের নাম প্রথম মাথা উঁচু করতে পেরেছিলো। ১৯ বছর পর আবার কানসৈকতে মর্যাদা নিয়ে উড়বে লাল-সবুজ পতাকা। গর্ব করার মতো এমন অর্জনের সময় ফিরে দেখা যাক কানে বাংলাদেশের ইতিহাসটা কেমন ছিলো বছরের পর বছর।

প্যারালাল বিভাগ

কান উৎসবে প্যারালাল বিভাগ হিসেবে ১৯৬২ সালে সিমেন দ্যু লা ক্রিতিক (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকস উইক) আর ১৯৬৯ সালে যুক্ত হয় ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইট। এ দুটি বিভাগে নির্বাচিত ছবিগুলোকে কানের আয়োজকরা স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। যেমন প্রতিবছর সমাপনী আয়োজনে প্রদান করা ক্যামেরা দ’র পুরস্কারের জন্য অফিসিয়াল সিলেকশনের পাশাপাশি প্যারালাল বিভাগ দুটিতে নির্বাচিত নবাগত পরিচালককে মনোনয়নে রাখা হয়। অফিসিয়াল সিলেকশনের পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকস উইক ও ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইটে নির্বাচিত ছবিগুলোকে পুরস্কারের বেলায় বিবেচনায় রাখে চলচ্চিত্র সমালোচকদের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ফিপরেস্কি।

ফরাসি চলচ্চিত্র সমালোচকদের চালু করা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকস উইকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পরিচালকদের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ছবিকে জায়গা দেওয়া হয়। ১৯৬৮ সালে ফ্রান্স জুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের কারণে কান উৎসব বাতিল হওয়ার পরের বছর ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইট বিভাগ চালু করে ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি। ২০০২ সালে এতে নির্বাচিত হয় তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফিল্ম ক্রিটিকস তথা ফিপরেস্কি পুরস্কার জেতে ছবিটি। কানে বাংলাদেশের পাওয়া একমাত্র পুরস্কার এটাই।

ফিপরেস্কির বিচারক

২০০২ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফিল্ম ক্রিটিকসের (ফিপরেস্কি) বিচারক ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সমালোচক আহমেদ মুজতবা জামাল। এরপর ২০০৫ ও ২০০৯ সালে আরও দু’বার ফিপরেস্কির বিচারকের আসনে দেখা গেছে তাকে। 

২০১৯ সালে ফিপরেস্কির বিচারক হয়েছেন সাদিয়া খালিদ রীতি। বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই দায়িত্ব পেয়েছেন।

লা’এতেলিয়ার

কানে ‘মাটির ময়না’র ফিপরেস্কি পুরস্কার অর্জনের ১৫ বছর পর (২০১৭ সাল) বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক একটি ঘটনা দেখা গেছে। সিনেফঁদাসো বিভাগের লা’এতেলিয়ার কার্যক্রমের ১৩তম আসরে নির্বাচিত হয় ‘শুনতে কি পাও’-এর নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমনের ‘ডে আফটার টুমরা’র চিত্রনাট্য। এটিকে বিশেষভাবে সম্ভাবনাময় ও আশাব্যঞ্জক মনে করেছেন আয়োজকরা। কানসৈকতে তার আমন্ত্রণ পাওয়া বাংলাদেশের জন্য ছিলো গৌরবের। 

লা’এতেলিয়ার কার্যক্রমে নিজে থেকে অংশ নেওয়া যায় না, এজন্য আমন্ত্রণ পেতে হয়। লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের ‘ওপেন ডোর্স হাব’-এ প্রতিযোগিতায় ছিলো ‘ডে আফটার টুমরো’র চিত্রনাট্য। সেখানে নতুন নির্মাতার খোঁজে গিয়েছিলেন ২০০৫ সালে চালু হওয়া লা’এতেলিয়ারের পরিচালক। তার কাজই হলো সারা দুনিয়ার উৎসব ঘুরে ঘুরে গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা আর তাদের সম্ভাবনাময় চিত্রনাট্য খুঁজে বের করা। ‘ডে আফটার টুমরো’ তথা ‘অন্যদিন’-এর চিত্রনাট্য নির্বাচিত হওয়ায় বিভিন্ন দেশের পেশাদার চলচ্চিত্রকর্মীদের সঙ্গে কয়েকদিন ধরে চিন্তাভাবনার আদান-প্রদান করেন কামার আহমাদ সাইমন। এছাড়া গ্রাঁ পালেতে ফটোসেশনে অংশ নেন। 

লা ফেব্রিক সিনেমা

কান উৎসব চলাকালে ফ্রান্স সরকারের ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট আয়োজন করে ‘ত্যু লে সিনেমাস দ্যু মন্দ’ (অল দ্য সিনেমাস অব দ্য ওয়ার্ল্ড)। এর প্যাভিলিয়নে থাকে ‘লা ফেব্রিক সিনেমা’র (দ্য সিনেমা ফ্যাক্টরি) আনুষ্ঠানিকতা। মর্যাদাসম্পন্ন কান উৎসব স্বীকৃত প্যারালাল বিভাগগুলোর মধ্যে এটি একটি। মার্শে দ্যু ফিল্মে অংশ নিতে আসা বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র পরিবেশক ও এজেন্টদের সঙ্গে উদীয়মান তরুণ নির্মাতাদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়াই এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য। 

লা ফেব্রিক সিনেমার এবারের আসরে নির্বাচিত বিভিন্ন দেশের সম্ভাবনাময় মোট ১০টি ছবির চিত্রনাট্যের মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ, ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ প্রযোজনা ‘একা’। এর ইংরেজি নাম ‘সলো’। এটি  বাংলাদেশ থেকে প্রযোজনা করছেন আরিফুর রহমান। 

কামার আহমাদ সাইমনের আরেকটি অর্জন আছে কানের প্যারালাল বিভাগে। ২০১৪ সালে তার ‘শঙ্খধ্বনি’র চিত্রনাট্য নির্বাচিত হয় লা ফ্রেব্রিক সিনেমায়। কামারের সঙ্গী ছিলেন প্রযোজক সারা আফরীন। কানের ৭২তম আসরে লা ফ্রেব্রিক সিনেমায় মনোনীত হয় মেহেদি হাসানের প্রথম চলচ্চিত্র ‘স্যান্ড সিটি’র পাণ্ডুলিপি। তার সঙ্গী ছিলেন প্রযোজক রুবাইয়াত হাসান। 

মার্শে দ্যু ফিল্ম

কান উৎসব হলো চলচ্চিত্র কেনাবাচার একটি বৈশ্বিক আসর। যে কেউ চাইলেই নিজের ছবি নিয়ে এখানে আসতে পারে। ফলে বিভিন্ন দেশের প্রযোজক, পরিচালক, পরিবেশক ও কলাকুশলীসহ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা জমায়েত হন এই শাখায়। মার্শে দ্যু ফিল্মে সারাবিশ্ব থেকে আসা নির্মাতারা বিক্রয়ের কৌশল প্রয়োগ করে পৃথিবীর খ্যাতনামা চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের কাছে নিজেদের নির্মাণাধীন কিংবা নির্মিত ছবির নানান সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তারা বিভিন্ন চলচ্চিত্র প্রকল্পের প্রযোজনা, পরিবেশনা ও নির্মাণ বিষয়ে একে অপরের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং নির্মাণ ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত হন। কান উৎসবের প্রাণকেন্দ্র পালে দে ফেস্টিভাল ভবন এবং এর কাছাকাছি কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহসহ দক্ষিণ ফরাসি উপকূলের শহরটিতে মার্শে দ্যু ফিল্মের ছবির প্রদর্শনী হয়।

এবারের মার্শে দ্যু ফিল্মে ভারতের এনএফডিসি ফিল্ম বাজার থেকে আমন্ত্রিত হয়েছে নুহাশ হুমায়ূনের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুভিং বাংলাদেশ’। গত বছর গোয়া ফিল্ম বাজারে নির্বাচিত হয় এটি। মার্শে দ্যু ফিল্মের কো-প্রোডাকশন শাখা এবার বিভিন্ন দেশের বেশকিছু চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে কাজ করছে। সেই তালিকায় অন্যতম ভারতের এনএফডিসি ফিল্ম বাজার। মার্শে দ্যু ফিল্মের কো-প্রোডাকশন ডে’র জন্য ভারতের এনএফডিসি ফিল্ম বাজার থেকে সাতটি প্রকল্প নির্বাচিত হয়েছে। নুহাশ হুমায়ূনের ‘মুভিং বাংলাদেশ’ এর মধ্যে একটি। ছবিটির বাংলাদেশি প্রযোজক গুপি বাঘা প্রোডাকশনসের আরিফুর রহমান ও বিজন ইমতিয়াজ।

২০১৬ সালে মার্কেট স্ক্রিনিংয়ে ‘অজ্ঞাতনামা’ নিয়ে এসেছিলেন তৌকীর আহমেদ। তার সঙ্গী ছিলেন বিপাশা হায়াত। একই আসরে অমিতাভ রেজা চৌধুরী দেখিয়েছেন ‘আয়নাবাজি’। ২০১৩ সালে অনন্ত জলিল পরিচালিত ও অভিনীত ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ কান শহরে প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া করে দেখানো হয়েছে। ২০১৮ সালে জাজ মাল্টিমিডিয়ার প্রযোজক আব্দুল আজিজ পালে দে ফেস্টিভাল ভবনের একটি প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া করে ‘পোড়ামন ২’ দেখিয়েছেন।

কান ডকস

মার্শে দ্যু ফিল্মের অন্যতম একটি প্রোগ্রামের নাম ‘কান ডকস’। এতে ‘ডকস-ইন-প্রোগ্রেস’ বিভাগে নির্বাচিত প্রামাণ্যচিত্র প্রকল্পগুলোর জন্য পোস্ট প্রোডাকশন অর্থায়নের দুয়াল খুলে যেতে পারে। ১৩ জুলাই ডক ডে’তে ছয়টি পুরস্কার দেওয়া হবে। তালিকায় ইন্টারন্যাশন্যাল ফিল্ম ইনিশিয়েটিভ অব বাংলাদেশের সহযোগিতায় শোকেস সাউথ এশিয়ায় নির্বাচিত চারটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকল্পের মধ্যে দুটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে তাহরিমা খান পরিচালিত ‘মুন্নি’র প্রযোজক আবু শাহেদ ইমন। এছাড়া ‘থার্টিন ডেস্টিনেশনস অব অ্যা ট্রাভেলার’ যৌথভাবে প্রযোজনা করেছেন বাংলাদেশের মোখলেসুর রহমান তালুকদার লেনিন ও কলকাতার সৌম্য মুখোপাধ্যায়। এটি পরিচালনা করছেন পার্থ দাস। 

শোকেস সাউথ এশিয়ায় নির্বাচিত প্রকল্প দুটির ১০ মিনিট করে রাফ-কাট উপস্থাপনা থাকবে আগামী ৭ জুলাই অনলাইনে এবং ১০ জুলাই সরাসরি। এতে অংশ নেবেন ইন্টারন্যাশন্যাল ফিল্ম ইনিশিয়েটিভ অব বাংলাদেশের সভাপতি সামিয়া জামান। এছাড়া ট্রেনিং প্রোগ্রামস, ওয়ার্কশপ ও ল্যাবসে অনলাইনের মাধ্যমে যুক্ত হবেন ঢাকা ডক ল্যাবের পরিচালক তারেক আহমেদ।

ঢাকা টু কান

বাংলাদেশের উদীয়মান চলচ্চিত্রকারদের সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭০তম আসরে চালু হয় ‘ঢাকা টু কান’ শীর্ষক একটি প্রকল্প। ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ইনিশিয়েটিভ অব বাংলাদেশের (আইএফআইবি) এই আয়োজনে নেতৃত্ব দেন নির্মাতা সামিয়া জামান। তিনি সংগঠনটির সভাপতি। তাকে সহযোগিতা করছে ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জিং ফিল্ম ট্যালেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইইএফটিএ)। এ কার্যক্রমে ২০১৭ সালে তরুণ নির্মাতা আবিদ মল্লিক ও লুবনা শারমিন আর ২০১৮ সালে রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত ও সুমন দেলোয়ার অংশ নেন। মার্শে দ্যু ফিল্মের প্রডিউচার্স ওয়ার্কশপে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র পরিচালক, চলচ্চিত্র নির্বাহী ও চলচ্চিত্র শিল্পের প্রভাববিস্তারকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ পেয়েছেন তারা।

শর্ট ফিল্ম কর্নার

চলচ্চিত্রের বৈশ্বিক আসর কান উৎসবে শৈল্পিক ও ভিন্নধারার নির্মাণকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় বেশি। সেজন্যই সারাবিশ্বের প্রতিভাবান নির্মাতাদের মিলনমেলায় পরিণত হয় কান। এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ শর্ট ফিল্ম কর্নার। এতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ছোট দৈর্ঘ্যের ছবিগুলো অংশ নিতে পারে। উঠতি নির্মাতাদের জন্য এটি একটি অবারিত দুয়ার। এর মাধ্যমে পেশাদার চলচ্চিত্রকর্মীদের সঙ্গে তাদের ভাবনার আদান-প্রদান হয়। নবীন নির্মাতাদের কর্মশালা করাতে আয়োজকরা খ্যাতিমান নির্মাতাদের নিয়ে আসেন। সেমিনার হয়। বিভিন্ন উৎসব প্রোগ্রামারদের সঙ্গে আড্ডা থাকে। তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা ও জানার সুযোগ হয়। কর্মশালা করান অস্কার মনোনীত ছবির পরিচালকরা।

কানের গত কয়েক আসরে শর্ট ফিল্ম কর্নারে বাংলাদেশি তরুণ নির্মাতাদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০১৭ সালে জসীম আহমেদের ‘দাগ’ এবং ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর ‘ঢাকা ২.০০’ অংশ নেয় এতে। জসীম আহমেদের সঙ্গী ছিলেন তার ছবির আবহ সংগীত পরিচালক পার্থ বড়ুয়া। 

৭১তম কান উৎসবের শর্ট ফিল্ম কর্নারে বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছে জসিম আহমেদের ‘অ্যা পেয়ার অব স্যান্ডেল’, নোমান রবিনের ‘অ্যা কোয়ার্টার মাইল কান্ট্রি’, ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর ‘রোয়াই’ এবং মনজুরুল আলমের ‘মেঘে ঢাকা- লাইফ উইদাউট সান’। ৭২তম কানের শর্ট ফিল্ম কর্নারে ছিলো আশরাফ শিশিরের ‘যুদ্ধটা ছিলো স্বাধীনতার’।

তবে কানের শর্ট ফিল্ম কর্নারে ছবি জমা দিলেই স্থান পাওয়া যায় না। কান উৎসব কর্তৃপক্ষের চোখে ‘শিল্পমানসম্মত’ ছবি এই বিভাগে জায়গা পায়। যদিও এটি অফিসিয়াল সিলেকশন নয়। স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির বিভাগে দৈর্ঘ্য হতে হয় সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট। কিন্তু শর্ট ফিল্ম কর্নারে ৩০ মিনিটের ছবিও জমা দেওয়া যায়।

শর্ট ফিল্ম কর্নারে অংশ নেওয়া নির্মাতাদের কেউ কেউ মার্কেট স্ক্রিনিং কিনে ক্রেতা ও এজেন্টদের ছবি দেখান। এটি হলো প্রফেশনাল স্ক্রিনিং। এমন প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য ছবি বিক্রি করা। কানের শর্ট ফিল্ম কর্নারে ছবি রাখা কোনও অর্জন নয়। তবে সেখান থেকে ছবিটির পরিবেশনা নিশ্চিত হলে নির্মাতার ক্যারিয়ারের জন্য ইতিবাচক হয়। কানের ভিডিও লাইব্রেরির মাধ্যমেও ছবি বিক্রি হয়।

কান ক্ল্যাসিকস

২০১৬ সালের কান ক্ল্যাসিকস বিভাগে অন্যভাবে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। এতে প্রদর্শিত হয় খান আতাউর রহমান অভিনীত পুনরুদ্ধার করা ধ্রুপদী উর্দু ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ (১৯৫৮)। এর দৃশ্যায়ন হয়েছিল ঢাকা থেকে ৩০ মাইল দক্ষিণে মেঘনা নদীর তীরে একটি জেলেপল্লিতে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান সময়ের সঙ্গে অর্থবহ ও প্রাসঙ্গিক হিসেবে এটি দেখানো হয় কানে। বাংলাদেশে চিত্রায়িত এটাই প্রথম ছবি যেটি কান উৎসবের আয়োজকরা সম্মানজনক তালিকায় স্থান দিয়েছেন।

২০১৬ সালের ১৪ মে পালে দে ফেস্টিভাল ভবনের সাল বুনুয়েল প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয় ‘জাগো হুয়া সাভেরা’। এর সুবাদে দক্ষিণ ফরাসি সমুদ্র উপকূলে উঠে আসে বাংলাদেশের নদীমাতৃক জীবন। আখতার জে. কারদার পরিচালিত এই ছবিতে সহকারী পরিচালক ছিলেন চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। ‘জাগো হুয়া সাভেরা’তে প্রথম তুলে ধরা হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষের জীবন-বাস্তবতা। জেলেদের নদীনির্ভর জীবনযাপন ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াইয়ের বিরল একটি কাজ ভাবা হয় এটি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অবলম্বনে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের চিত্রনাট্যে তৈরি হয় ছবিটি।

ইত্তেফাক/জেএইচ