প্রশিক্ষণের অনেক কার্যকর পদ্ধতি আছে, তবে তা নিয়ে আলোচনা উদ্দেশ্য নয়। দেশের প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানসমূহে কার্যকরী প্রশিক্ষণ পদ্ধতি কতটা ব্যবহূত হচ্ছে বা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে, তা-ই এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়। প্রশিক্ষণের বহু কার্যকরী পদ্ধতি থাকলেও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণে শুধু লেকচার পদ্ধতির প্রচলন আছে, যেখানে সেশন পরিচালক অনর্গল বলে যান, প্রশিক্ষণার্থী শুনে যান। হয়তো বড়জোর কেউ কেউ শেষের দিক ৫-১০ মিনিট প্রশ্নোত্তরের জন্য বরাদ্দ রাখেন। অনেক প্রশিক্ষক বয়সনির্বিশেষে চেয়ারে বসেই পুরো সেশন চালিয়ে যান, ফলে তার বক্তব্য আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশিক্ষণার্থীরা শুধু শুনেই যান, বোঝেন না, বোঝার চেষ্টা করেন না বা মনে রাখার চেষ্টা করেন না। এক্ষেত্রে বডি ল্যাংগুয়েজ, আই কন্টাক্ট প্রায় শূন্যের কোটায়। ফলে অনেক প্রশিক্ষণার্থী তন্দ্রা পরিহার করতে পারেন না। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এক মহিলা প্রশিক্ষণার্থী একদিন সেশন শেষে অকপটে তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন এভাবে—‘স্যার, কয়েক মাস ধরে প্রশিক্ষণে আছি। সম্ভবত আজকের এ সেশনেই প্রথম অভিজ্ঞতা হলো যে চার ঘণ্টার সেশনে আমরা কেউ একটুও ঘুমাতে পারিনি।’ সেশন পরিচালনা আকর্ষণীয় করা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সন্নিবেশ ঘটানো বা বিচিত্র উপাদানের সমাবেশ ঘটানো মূলত প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের অনুষদ সদস্য বা প্রশিক্ষক দ্বারাই সম্ভব। সেজন্য একদিকে তাদের আগ্রহ, ঐকান্তিকতা, একাগ্রতা এবং দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, অন্যদিকে ২০০৩ সালের জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ নীতিমালার ৮.৪ নীতি অনুযায়ী প্রশিক্ষক হিসেবে বিশেষায়িত করে গড়ে তুলতে হবে। প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক অনুষদ সদস্যের অনুপস্থিতি বা ঘন ঘন বদলির কারণে এটা বাস্তবায়িত করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে অতিথি বক্তারা এক্ষেত্রে যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন না বা দিতে আগ্রহী নন। অনুষদ সদস্যদের ‘প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ বা টিওটি কোর্সে অংশগ্রহণ করা একান্তই জরুরি, কিন্তু পরিতাপের বিষিয়, এ বিষয়টি একেবারেই উপেক্ষিত এবং টিওটি কোর্স আজকাল একেবারেই কম অনুষ্ঠিত হয়। শুধু সেশন পরিচালনা নয়, এমনকি কোর্স পরিচালনাও অনভিজ্ঞদের নিয়োজিত করা হচ্ছে নিয়তই। প্রতিষ্ঠানে যোগদান করার সঙ্গে সঙ্গেই অর্থাত্ অভিজ্ঞতা অর্জনের আগেই কাউকে কাউকে কোর্স পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। একবার এক প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে গেলেই কোর্স সমন্বয়ক এসে বললেন, ‘স্যার, এ পত্রে স্বাক্ষর করুন।’ বললাম, আমি তো এখনো যোগদান করিনি।’ সমন্বয়কের উত্তর, ‘স্যার, আপনি এ কোর্সের পরিচালক, আগে স্বাক্ষর করুন, পরে যোগদান করবেন।’ উল্লেখ্য, পত্র ছিল কোনো কোর্সের জন্য মনোনীত প্রশিক্ষণার্থীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে পত্র। প্রশিক্ষণের মান অনেকাংশে বক্তার ওপর নির্ভরশীল। বক্তা কতটুকু অভিজ্ঞ ও পারদর্শী, কতটুকু আগ্রহশীল, কোন প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন তার ওপর সেশনের সফলতা নির্ভরশীল। তাছাড়া বিষয়ের প্রায়োগিকতা কিংবা বক্তৃতা প্রদানের সহায়ক পরিবেশের ওপর প্রশিক্ষণের মান নির্ভর করে। বলা হয় বক্তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তার সেশন পরিচালনার উত্কর্ষের মাপকাঠি। এজন্য অনেক সরকারি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন উত্স থেকে বিভিন্নমুখী অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞদের সেশন পরিচালনার জন্য সুযোগ করে দেখা হয়। বহুল আলোচিত বিষয় হচ্ছে মাঠ প্রশাসন থেকে ডেপুটেশনে প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিতদের একটা হারে বিশেষ ভাতা দেওয়া হয়, যারা ডেপুটেশন নন অর্থাত্ ঐ প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োজিতদের জন্য এ সুযোগ নেই। এখানেও এ যুক্তি উত্থাপন করা হয় যে, মাঠ প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে তারা কোনো নির্ধারিত বিষয়ের প্রায়োগিক সুবিধা অসুবিধাসহ বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করতে সক্ষম এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে সক্ষম। যদিও শুধু ডেপুটেশনধারীদের বিশেষ ভাতা প্রদানের এ পদ্ধতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা লেখালেখি, আবেদন-নিবেদন বহুদিন থেকে চলে আসছে। বলা হচ্ছে যে যারা প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগকৃত, তাদের ও একই হারে বিশেষ ভাতা প্রদান করা দরকার। আগেই বলা হয়েছে, যারা প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞ এবং আগ্রহী, তাদের অধিকাংশ সময়ই ঐসব প্রতিষ্ঠানে পদায়ন করা হয় না। ফলে যারা প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে থেকে সেশন পরিচালনা করেন তাদের দক্ষতায় যেমন ঘাটতি থাকে, তেমনি ঘাটতি থাকে আগ্রহে; ঐকান্তিকতায়। প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে পদায়িত থেকে যারা সেশন পরিচালনা করেন কিংবা যারা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে আদৌ আগ্রহী নন, তাদের ক্ষেত্রে উত্সাহ প্রদান বা তিরস্কার করার কোনো নীতিমালা নেই, মোট সেশনের কত শতাংশ সেশন অনুষদ সদস্যদের পরিচালনা করতে হবে, তা নির্ধারিত নেই। সরকারি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নেই, সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নীতিমালা প্রণয়নের এক্তিয়ার নেই। তাছাড়া সেগুলোর আয়বর্ধক কোর্স পরিচালনার বা ব্যয় নির্বাহক এক্তিয়ার নেই বিধায় অর্থসংস্থানের জন্য এবং নীতিমালা ও বিধিবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়/বিভাগের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। এ সুযোগের অপব্যবহার করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়/বিভাগের কোনো কোনো কর্মকর্তা সেশন পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে বক্তা নির্বাচনে অনুষদ সদস্য বা কোর্স ব্যবস্থাপনার সদস্যদের সঙ্গে অন্যান্য কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পরিচয় বেশি প্রাধান্য পায়, প্রাধান্য পায় অতিথি বক্তার পদনামের উচ্চতা, ক্ষমতা বা প্রভাবপ্রতিপত্তি। প্রশিক্ষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের অধিকাংশই অন্যত্র বদলি হতে সদা উন্মুখ থাকেন বিধায় ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের রীতিমতো তোয়াজ করেন, যা স্বাভাবিক প্রটোকলের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এ রূপ চিত্রও দেখা গিয়েছে যে, কোনো কোনো ক্ষমতাধর কর্মকর্তাকে রিসিভ করার জন্য অভ্যর্থনাকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠানপ্রধানসহ একদল কর্মকর্তা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে থাকেন। প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করেছেন, যারা প্রশিক্ষক হিসেবে বা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপক হিসেবে কমবেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, প্রশিক্ষণকাজে যাদের আগ্রহ আছে, যারা যত্ন সহকারে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সেশন প্রস্তুত করেন, কিছু ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে তাদেরকে ঐসব প্রতিষ্ঠান থেকে অন্যত্র বদলি হয়ে যাওয়ার পর, সেশনে পরিচালনার জন্য খুব বেশি আমন্ত্রণ জানানো হয় না। এটি একটি অঘোষিত এবং দীর্ঘদিনের পুরোনো নিয়ম। এ নিয়ে ক্ষোভ, অসন্তোষ জানিয়েছেন অনেকেই, এমনকি একসময়ের বিপিএটিসির জনৈক এমডিএস, যিনি পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির তত্কালীন ডিজি মহোদয়কে লিখিতভাবে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। এর কারণ নানাবিধ হতে পারে। যেমন, প্রথমত কোনো একটি প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানের পুরোনো সেই কর্মকর্তাদের সঙ্গে বর্তমান সেটের কর্মকর্তাদের একটা অঘোষিত মানসিক দূরত্ব থাকে, থাকতে পারে ঐ প্রতিষ্ঠানে উভয় সেটের কর্মকর্তাদের সুনাম অর্জনের একটা নীরব প্রতিযোগিতা। দ্বিতীয়ত, পুরোনো সেটের কর্মকর্তারা নতুন সেটের কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন করতে চান না, তাও মানসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই। তৃতীয়ত, উভয় দলের সদস্যরা হীনম্মন্যতায় ভোগেন বিধায় মানসিক চাপ বোধ করেন। চতুর্থত, ক্ষমতাবান প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের তোয়াজ করতে গিয়ে স্বাভাবিক কারণেই অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতাবানদের গুরুত্ব প্রদানের ফুরসত পান না। যার কারণে প্রশিক্ষণ-প্রতিষ্ঠানগুলো অভিজ্ঞতাসম্পন্নদের সেবা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়। কোনো বক্তা প্রথম বার কোনো কোর্সে আমন্ত্রিত হলে রেওয়াজ অনুযায়ী তাকে রিসিভ করা হয় এবং প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এবং এটা প্রয়োজনও বটে। কিন্তু যখন দেখা যায়, অতিথি বক্তার পরিচয় দিতে গিয়ে মূল সেশনের প্রায় ১০-১৫ মিনিট অতিবাহিত হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু বক্তার জীবনবৃত্তান্ত কি না। হাস্যকর ব্যাপার যে, কখনো কখনো অতিথি বক্তার স্ত্রী এবং সন্তানদের বায়োডাটাও পরিচয়পর্বে পাঠ করা হয়। বক্তা নির্বাচনে আরো যেসব বিষয় প্রাধান্য পায় তা হলো, বক্তার চাকরির ব্যাচ, ক্যাডার, আঞ্চলিকতা, আগে একই কর্মক্ষেত্রে কোর্স ম্যানেজমেন্ট টিমের সদস্যদের সঙ্গে চাকরি করা, সমিতি বা গোষ্ঠীচেতনা ইত্যাদি। বক্তা নির্বাচনের গাইডলাইনস বা নীতিমালা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই নেই, আবার থাকলেও তা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বক্তা নির্বাচনে প্রশিক্ষণার্থীদের পূর্ববর্তী সেশনের মূল্যায়ন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুরুত্ব দেওয়া হয় না বিধায় প্রশিক্ষণার্থীরাও ঐসব বক্তার সেশনে মনোযোগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। প্রশিক্ষণার্থীদের মূল্যায়ন ছাড়াও কোর্স ব্যবস্থাপনা বা অনুষদ সদস্যদের দ্বারা ও বক্তা মূল্যায়নে তত্পর হওয়া প্রয়োজন। বক্তা সময়মতো সেশন শুরু ও শেষ করেন কি না, অপ্রাসঙ্গিক বিষয় আলোচনায় প্রাধান্য পায় কি না, হাস্য-কৌতুকে মাত্রাতিরিক্ত সময় কাটান কি না, খোশগল্পে অতিরিক্ত সময় ব্যয়িত হয় কি না, বডি ল্যাংগুয়েজ সঠিক কি না, প্রশিক্ষণার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করাতে সক্ষম কি না, এসব বিষয় লক্ষ রেখে ভবিষ্যতে বক্তা নির্বাচন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। এমনও দেখা গেছে যে মডিউলের শুরুতে প্রথম দু-একটি সেশনে সকল প্রশিক্ষণার্থীরা কোনো নির্দিষ্ট বক্তার খুব প্রশংসা করলেন। কিন্তু মডিউল শেষে হা-পিত্যেশ! ব্যাপারটা এমন যে এতদিন তো ভালোই কাটল, এখন তো মনে হয় কিছুই শেখা হলো না। আবার অভিজ্ঞতায় এমনও দেখা গিয়েছে কখনো কখনো অতিরিক্ত সিনসিয়ার বক্তাকে অনেক সময় প্রশিক্ষণার্থীরা খুব একটা পছন্দ করেন না, চাপ অনুভব করেন, বিরক্তিও বোধ করেন। পক্ষান্তুরে খোশগল্প, হাসিঠাট্টায় কোনো বক্তা ব্যস্ত থাকলে প্রশিক্ষণার্থীরা ভালো মূল্যায়ন করেন। যে সকল বক্তা প্রশিক্ষণার্থীদের পরস্পর কথা বলাকে নিরুত্সাহিত করেন, ঘুমাতে দেন না, ক্লাস পরীক্ষা, অ্যাসাইনম্যান্ট, অনুশীলন করান তাদেরকে অনেক প্রশিক্ষণার্থী পছন্দ করেন না। (বিষয়টি নিয়ে পরে আরো লিখব)
n লেখক :প্রাক্তন সচিব