ধরুন ঢাকা মেডিক্যালের পার্কিং লটে আপনার গাড়িটি রেখে রোগীকে নিয়ে ভেতরে গেলেন। এরপর হঠাত্ই বিকট শব্দ। প্রচণ্ড কম্পন। নিচে এসে দেখলেন আপনার গাড়িটি সমতল থেকে ১০০ ফুট বা তারও গভীর এক দানবীয় গর্তে পড়ে আছে। হরর ছবির দৃশ্যের মত অবিশ্বাস্য লাগলেও এমনটাই বাস্তব। গত ৭ জুন জেরুজালেমের একটি হাসপাতালের পার্কিংয়ে পরপর তিনটি গাড়ি পড়ে যায় বিরাট দানবীয় গর্তে। ১৫ জুন মুম্বাইয়ে আরেকটি গাড়ি পার্কিংয়েও হঠাত্ করে এমন দানবীয় গর্তের সৃষ্টি হয়। গত এক মাসে পরপর পাঁচ দেশে দানবাকৃতির গর্তের ঘটনা ঘটে। মূলত গত কয়েক বছর ধরে নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে এমন ‘দানবগর্ত’। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘সিংকহোল’।
ভূতুড়ে এই দুর্যোগটি ‘সিংকহোল’ ছাড়াও সিনোট, সিংক, সোলেলেট, গিলে গর্ত বা ডোলিন নামেও পরিচিত। আমেরিকার ভূতত্ত্ব জরিপ সংস্থার মতে, ভূগর্ভস্থ পানি অথবা খনিজ উত্তোলন করা হলে মাটির অভ্যন্তরে ফাঁপা জায়গা তৈরি হয়। নিচের স্তরের মাটি যখন ভূমির ওপরের চাপ নিতে পারে না তখনই ধসে পড়ে আর তৈরি হয় বিশালাকার গর্ত তথা সিংকহোল। রাস্তায়, খেলার মাঠে, ফসলি জমি কিংবা উন্মুক্ত প্রান্তরে যে কোনো সময় তৈরি হতে পারে এমন সিংকহোল। ভিন্ন ভিন্ন এলাকাভেদে সিংকহোলের আকার বা গভীরতাও একেক রকম হয়ে থাকে। যেমন—সাইবেরিয়ায় প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে দানবগর্ত। ইয়েমেনের আল মাহরা রাজ্যের ‘নরকের কুয়া’ নামের সিংকহোলটি ১০০ ফুট চওড়া এবং ২৫০ ফুট গভীর। আবার ২০১৬ সালে জাপানের ফুকুওকা শহরের পাঁচ লেনের রাস্তা ধসে পড়ে সৃষ্ট হওয়া দানবীয় গর্তটি ১০০ ফুট চওড়া ও ৫০ ফুট গভীর। একটি সিংকহোল তৈরি হতে কয়েক দশক এমনকি শতাব্দী পর্যন্ত লেগে যায় বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। কিন্তু বর্তমানে প্রকৃতিতে হঠাত্ সিংকহোল তৈরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে বিশ্ব জুড়ে। গেল বছর ডিসেম্বরে এক ভূমিকম্পের পর ১০০-এর বেশি সিংকহোল তৈরি হয় ক্রোয়েশিয়ায়। ২০১৫ সালে গুয়েতেমালা শহরের একটি বিশাল সিংকহোল কয়েক ডজন বাড়ি গিলে ফেলেছিল। তুরস্ক, ইতালি, মেক্সিকো, স্পেন, চীন ও রাশিয়ায় সিংকহোলের আধিক্য রয়েছে। মধ্য আমেরিকার দেশ বেলিজে বহু আগে তৈরি হয়েছিল ১ হাজার ফুট বিস্তৃত বিশাল আকারের গর্ত। সবচেয়ে বেশি সিংকহোল তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়। তারপর তুরস্কের কোনিয়ায়। এখানে চলতি বছরেই সন্ধান মিলেছে ৬ শতাধিক সিংকহোলের। এলাকাটিতে দানবগর্তের সংখ্যা এক বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। আর রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলেও বিশালাকার গর্ত আছে। সর্বশেষ ভারতেও তৈরি হলো সিংকহোল।
ঝড়বৃষ্টি, ভূমিধসের মতোই বাড়ছে সিংকহোল। তাই বিশ্ব জুড়ে এই দানব দুর্যোগের উত্পত্তি ও কারণ নিয়ে চলছে নানান আলোচনা। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে প্রাকৃতিক ঘটনা মনে করলেও এসব দানবীয় গর্ত সৃষ্টির পেছনে রয়েছে মানুষের কর্মকাণ্ড। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু সংকটের সরাসরি প্রভাবে মনুষ্য বসতির কাছাকাছি এ ধরনের সিংকহোল উদ্ভব হচ্ছে। মূলত বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আশঙ্কাজনক হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বেড়েছে খরা। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সেচ ও অন্যান্য কাজে বেড়েছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা। মাত্রাতিরিক্ত পানি উত্তোলনে ইতিমধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে চলে গেছে। অধিক হারে খনিজ পদার্থ উত্তোলনও ভূগর্ভে শূন্যতা তৈরি করে। পরে ভূমির অসহ্য চাপে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে ভূমিধসে গিয়ে তৈরি হয় সিংকহোল। অপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ সুয়ারেজ লাইন বা মাটির নিচে নির্মাণকাজ শহরে সিংকহোল বৃদ্ধির কারণ। এছাড়া মাটিক্ষয়, মিথেন গ্যাসের প্রভাবও দায়ী। আবার অ্যাসিডিক বৃষ্টির জল চুনাপাথরের পর্দাকে খেয়ে ফেলে এবং উপরিভাগে গহ্বর তৈরি করে। কখনো কখনো ধসের ফলে ভূপৃষ্ঠে যা কিছু থাকে তা টেনে নিয়ে গিয়ে তৈরি হয় গর্ত। সভ্যতার বিনির্মাতা আমরা মানুষেরা অপরূপ প্রকৃতিকে ভয়ংকর সুন্দরে পরিণত করেছি। প্রকৃতির প্রতি আমাদের নির্মমতা আমাদের জন্য এখন কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে সিংকহোলের ধ্বংসাত্মক থাবার ফলাফল ভোগ করতে হবে মানুষসহ পুরো জীবকুলকে। চলুন নিজেদের শেষ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া