অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃমৃত্যু, দায় কার?

কেরোসিনের কুপিতে দুটো দিক থাকে, এক পাশ আলোকিত হলেও অন্য পাশ থাকে আঁধারে নিমজ্জিত। এই আঁধারে ডুবে থাকা মানুষের দুঃসংবাদ শুনেই আজ দিনটার সূচনা হলো। অতি অল্পবয়সি, বেশ মায়াবী একটা মেয়ের করুণ পরিণতি। বয়স ১৮ না পেরোতেই কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতা তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিয়েছেন। বছর না ঘুরতেই সেই মেয়ে গর্ভবতী হলো এবং বাচ্চা ডেলিভারি করানোর জন্য নিয়ে আসা হলো এক প্রশিক্ষণবিহীন ধাত্রীকে এবং সেই ধাত্রী বাচ্চা ডেলিভারি করানোর সময় অযাচিত নাড়ী কেটে ফেলেছেন, প্রচণ্ড রক্তপাতে অবশেষে মেয়েটির মৃত্যু হয়। নিদারুণ মর্মান্তিক একটা মৃত্যু। অথচ বাড়ি থেকে মাইল তিনেক দূরেই ছিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ছিল তাদের গ্রামেই একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। হাতের নাগালেই এখন কত সেবা!

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজনন স্বাস্থ্য কর্মসূচির তথ্য মতে, বর্তমানে দেশের সবকটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ৬২টি জেলা হাসপাতাল, ৪০১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৭০টি মা ও শিশুকেন্দ্রসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানে জরুরি প্রসূতিসেবা কার্যক্রম সেবা চালাচ্ছে। তার পরও থেকেই যাচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃমৃত্যু। এখনো দেশে দুইটির শিশুর মধ্যে একটির জন্ম হচ্ছে বাড়িতে, অদক্ষ দাইয়ের হাতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে হাসপাতালে প্রসবের হার মাত্র ২৯ শতাংশ। অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের প্রসব-পূর্ব সেবা গ্রহণের হার মাত্র ২৬ শতাংশ, প্রসব-পরবর্তী সেবা গ্রহণের হার ২৭ শতাংশ। সনাতন পদ্ধতিতে প্রসব হলে মা ও শিশুর জীবন রক্ষা করা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে যায়। দেশে মাতৃমৃত্যুর উচ্চ হার রয়েছে, এখনো প্রতি লাখে ১৬৫ জন মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই অবস্থায় ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু ৭০-এ নামিয়ে আনা সত্যিই কঠিন।

বাংলাদেশে প্রতি হাজার জীবন্ত বাচ্চা প্রসবে আট জন ধাত্রী থাকেন অর্থাত্ গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে এসব প্রশিক্ষণবিহীন ধাত্রীর ফলে প্রতি ১১০ জনে মৃত্যুর ঝুঁকি ১২ জনের! 

স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের সংগঠন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) মতে, গর্ভধারণের পর থেকে প্রসব পর্যন্ত একজন মাকে অন্তত চার বার সেবা নিতে হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নতুন নির্দেশনায় এ সেবা অন্তত আট বার নিতে বলা হয়েছে। তাদের গবেষণা অনুযায়ী, বাড়িতে প্রসবে ঝুঁকি থাকে। অনেক মায়ের প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও যন্ত্রপাতি থাকায় যে কোনো প্রসবকালীন জটিলতায় তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বাড়িতে যা সম্ভব নয়।

এই যে, একটি অল্পবয়সি মেয়ের মৃত্যু হলো, একটি শিশু মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হলো। এ দায় কার? অসচেতনতার নাকি অদৃষ্টের? না, এ দায় আমাদেরই। আমরাই তাদের অন্ধকূপ থেকে আলোয় উদ্ভাসিত করতে পারিনি, বাতির আলোকিত অংশ তাদের দেখিয়ে দিতে পারিনি। স্বার্থপরের মতো নিজেরাই আলোক বিচ্ছুরণ হাতে নিজেদের ঘর আলোকিত করেছি। সারা দেশে শতসহস্র স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক আছে, বাল্যবিবাহ রোধে অজস্র আইনকানুন রয়েছে। অথচ এরকম ঘটনা প্রতিনিয়ত আমাদের সম্মুখেই অহরহ ঘটে চলছে। যে শিশুটি জন্ম-মুহূর্তেই মৃত্যুমুখে পতিত হলো, পৃথিবীর আলো-হাওয়া থেকে বঞ্চিত হলো তার মৃত্যুর দায়ভার নেওয়ার মতো সত্সাহস কী আমাদের তৈরি হয়েছে?

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়