হালিম এসেছে বাজার করতে। সে চেয়ারম্যান সাহেবের খাস লোক। চেয়ারম্যান সাহেবের স্ত্রী তাকে বলে দিয়েছে বাজার থেকে জোড়া ইলিশ বড় সাইজের যেন অবশ্যই কিনে নিয়ে যায়। চাচী আম্মা ভালো মানুষ, সারাদিন রান্না বান্না নিয়ে থাকে। এই বাজারে বড় ইলিশ কম পাওয়া যায়। ইলিশ যে যা পায়, নিয়া ফেরিঘাট চলে যায়। ফেরিঘাটে দাম ভালো পাওয়া যায়, এখানে থাকে ছয়শ বা সাতশ গ্রামের মাছ। এগুলো নেওয়া যাবে না। মাছের নাও আটকিয়ে ইলিশ আনতে হবে।
আরো একজন ইলিশ খেতে চেয়েছে, তার স্ত্রী, সালেহা। তার সন্তান হবে, অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই। এই সময়ে তার ভালো মন্দ খেতে মন চায়। কিন্তু হালিম কিনতে পারে না। তার বড় ছেলেটার বয়স এগারো। দীর্ঘদিন পরে আবার গর্ভধারণ, তার শরীর ভালো থাকে না একদম। কিন্তু ইলিশ কই! একটু দূরে আজিজের নাও। হালিম হাকায়, আজিজ বাইইই, মাছ কেমন ? বড় ইলিশা আছে নি?
আজিজ ডাক ছেড়ে উত্তর দেয় , না বাইই! ইলিশ কই আর! আসলে বেঁচবে না।
সূর্য মধ্য গগণে। আযান দিয়েছে। আকাশে রোদ্দুর আর মেঘের লুকোচুরি। আজ হয়ত ঝড় বৃষ্টি হবে না, বৃষ্টি হলে এই ছোট্ট ঘরে খুব কষ্ট হয়। চাল ঠিক করা হয়নি। গত বছর ঝড়ে চাল উড়ে গিয়েছিল। ছেলেটার স্কুলের পরীক্ষার ফি দেওয়া লাগবে। বেতন না লাগলেও পরীক্ষার ফি তো লাগে। হালিমের ইচ্ছে, হাইস্কুলে পড়ে যদি দুই একটা পাশ দেয়, একটা চাকরি বাকরি জুটে যাবে, চেয়ারম্যান সাহেবের সুপারিশে।
সালেহার বেশি বয়সের সন্তান, শরীর ভাল থাকেনা প্রায়ই। ভাল মন্দ খাইতে চায় কিন্তু তেমন কিছু খাওয়া হয় না। বেচারা এই শরীরে সারা বাড়ির কাজ করতে থাকে।
দুইদিন আগে বলেছে, একটু ইলিশ মাছ ভাজা খাইতে মন চায়। হালিম মনে মনে ভাবছে, ইলিশ পাওয়া গেলেও আর সে তো খাইতে পারবে না। মুখের কাছে নিয়ে বলবে গন্ধ লাগে! হালিমের মনে আছে। বড় ছেলের জন্মের সময় একই কাহিনী করছিল।
বাজারে ইলিশ মাছের ছাও সব, বড় ইলিশ নাই
সাথে কিছু ট্যাংরা, পুটি, খলসে, নলা মাছ আর পাঙ্গাস মাছ। হালিম বাড়ির জন্য পুটি আর খলসে মাছ কিনে ফেলে। যাওয়ার সময় এইগুলি সালেহাকে দিয়ে যাবে।
অবশেষে জোড়া ইলিশ পাওয়া গেল। আজিজ ভাইই নিয়া আইসা দিলো। আরেকজনের নাওয়ে পেয়েছে নাকি। ইলিশ দুটো চকচক করছে, রাতেই ধরা হয়েছে। বাড়িতে গিয়ে সালেহাকে বাজার দিয়ে চেয়ারম্যান বাড়িতে যেতে হবে।
হালিম দ্রুত পা বাড়ায়। চেয়ারম্যান বাড়ির বাজার করা একটা সুবিধার কাজ, এই যে সে খলসে পুটি আর বেগুন কিনে ফেলল, নিজের টাকা লাগেনি। ইলিশের দাম থেকে মেরে দিয়েছে। রোজদিন সে বাজার করতে পারেনা। সপ্তাহে দুয়েকদিন তাকে চাচীজান বাজারে পাঠায়, সে দুয়েকদিন সে একই খরচে বাড়ির বাজারও সেরে ফেলে।
বাড়িতে ঢুকে সালেহাকে জোরে হাঁক ছেড়ে ডাকে হালিম। সালেহা আস্তে আস্তে বের হয়ে আসে। হালিমের হাতে ইলিশ দেখে বলে, ইলিশ উঠছে নি! চোখ চকচক করে তার।
হালিম উত্তর দেয়, এডি চোয়ারম্যান বাড়ির, তোর দেখনে কাম নাই, গন্ধ লাগবো! সালেহা ক্ষীন আশা করে, মাছটা কি রাখবে, নাকি নিয়ে যাবে। তার ইলিশ ভাজার জন্য কলিজা আনচাল করতাছে। হালিম সালেহাকে বলে খইলশা আর পুটি থাকল, বেগুন দিয়া ঝোল রান্ধিস তুই। আমি চেয়ারম্যান বাড়িত গেলাম।
হালিম জোড়া ইলিশ নিয়ে হেটে চলে যায়। সালেহা ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকিয়ে থাকে পথের দিকে। দারিদ্র্যের মত বড় অভিশাপ আর কিছু হয়না।
চেয়ারম্যান সাহেবের স্ত্রী ইলিশ দেখে খুবই খুশি হলেন। একদম তাজা। তিনি বললেন, এইজন্য আমি বলি আমার বাজার হালিম করুক, তা না, কলিমুদ্দিরে পাঠায়, দুনিয়ার হাবজাব বাজার থিকা আসে।
হালিম বলল, চাচীজান, যেই দাম, টেকা যা দিলেন সবই লাইগা গেছে দুইটা ইলিশে!
-হ, জানি, পদ্মার পাড়ে থাইকা ইলিশ খাই লাখ টেকা দিয়া, আর ইন্ডিয়ায় ইলিশ আটশ টেকা। কপাল হেগোর! আবার কাইট্টা বেচে, ফহিন্নিরা!
-চাচী, যাই কন, কাইট্টা বেচন কিন্তু ভালা, সালেহা ইলিশ ইলিশ করতাছে, কত গুলা দিন, কিন্তুক ইলিশ কিনুম কেমনে, এত্ত দাম!
-অর শরীর কেমন, খাইতে পারে? মুখে স্বাদ আছে?
-না চাচীজান, কিচ্ছু খাইতে পারে না। রান্ধে, পুলাডারে সাথে নিয়া, খাইতে পারে না কিচ্ছু!
-হালিম শোন, তুই বাড়িত যা, এই একটা মাছ নিয়া বউরে কাইটা বাইছা দিয়া আয়, রাইন্ধা খাউক।
হালিম নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনা। এক জোড়া ইলিশ তিন হাজার টেকা। সেই ইলিশ চাচী দিয়া দিতেছে! সে দেরী করে না, বাড়ি চলে যায়। কুটে বেছে রান্না করে সালেহা খেতে বসে, কিন্তু এক টুকরো মুখে দিতে পারেনা। গন্ধে পেট উল্টে আসে। হালিম আর হালিমের ছেলে গরম ভাত ইলিশের তরকারি দিয়ে খায়। সালেহা দূরে বসে বমি করে আর দেখে!