তালেব রানা
নরেন্দ্র মোদীর ‘ম্যাজিকে’ ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ২৮২টি আসনে জয় লাভ করে। সব মিলিয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৩৩৬টি আসন পায়। ১৯৮৪ সালের পর প্রথমবারের মতো কোনো রাজনৈতিক দল একক ক্ষমতায় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং একক শক্তিতে সরকার গঠন করে। বিজেপির জনসমর্থনের ভিত্তি ছিল হিন্দি-ভাষী উত্তর-মধ্য ভারত। মোট প্রদত্ত ভোটের মধ্যে বিজেপি ২০১৪ সালে ৩১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এরপর বেশিরভাগ রাজ্যে অনুষ্ঠিত বিধানসভা ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে জয়লাভ করেছে বিজেপি ও এর শরিকরা।
এক সময় মনে হয় বিজেপি অদম্য। তাদের ঠেকানো সম্ভব হবে না; কিন্তু ঠিক পাঁচ বছর পর লোকসভা নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগামী এপ্রিল-মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে লোকসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনের আগে বলা চলে মোদীর ম্যাজিক অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে ঘোষিত পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলে চরম বিপর্যয় দেখেছে বিজেপি। এর মধ্যে শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হিন্দি ভাষা-ভাষী রাজ্য রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে কংগ্রেসের কাছে হেরেছে তারা। ২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই তিনটি রাজ্যেই কংগ্রেসকে ধরাশায়ী করেছিল বিজেপি। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এর ফল পেয়েছিল হাতে-নাতে। গত লোকসভা নির্বাচনে এই তিন রাজ্যের ৬৫টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ৬২টি আসনে। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করেছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট। বলা হচ্ছে, এই সব রাজ্যের নির্বাচন ছিল লোকসভা নির্বাচনের আগে সেমিফাইনাল। এই ফলাফলের প্রতিফলন লোকসভা নির্বাচনেও থাকবে।
লোকসভা নির্বাচনের প্রায় মাস তিনেক আগে করা জরিপেও এর প্রমাণ মিলছে। ‘টাইমস নাও-ভিএমআর’ যৌথ জরিপের ফলে বলছে, লোকসভা ভোটে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ’ জোটের ভোট কমছে। এমনকি, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০১৪ সালে সরকার গঠন করা এনডিএ জোট এবার ম্যাজিক ফিগারেও পৌঁছতে পারবে না। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের আসন আড়াই গুণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাত্ এখন ভোট হলে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসন বৃদ্ধি এবং তৃণমূলের কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও উঠে এসেছে জরিপে।
টাইমস নাউ এবং ভিএমআর-এর যৌথ জরিপ অনুযায়ী এনডিএ পেতে পারে ২৫২টি আসন। ম্যাজিক ফিগারের চেয়ে যা ২০ কম। ইউপিএ জোট পেতে পারে ১৪৬টি আসন। আঞ্চলিক দলগুলো মিলে পেতে পারে ১৪৫টি আসন। সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) জোট ৫১টি, তৃণমূল ৩২টি এবং জগনমোহন রেড্ডির ওয়াইএসআর কংগ্রেস পেতে পারে ২৩টি আসন।
২০১৪ সালের চেয়ে এনডিএ জোটের কমতে পারে ৮৪টি আসন। আর ইউপিএ-র আসন বাড়তে পারে ৮৬টি। গতবার এই সংখ্যা ছিল ৬০; কিন্তু এনডিএ বা ইউপিএ কোনো জোটই একার ক্ষমতায় সরকার গঠন করতে পারবে না এটা অনেকটাই স্পষ্ট। তার জন্য নির্ভর করতে হবে এসপি-বিএসপি জোট, তৃণমূল কংগ্রেস, তেলুগু দেশম পার্টি, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, ডিএমকে-র মতো আঞ্চলিক দলগুলির উপর। ভারতের রাজনীতিতে প্রচলিত আপ্তবাক্য, ‘উত্তরপ্রদেশ যার, দিল্লি তার’। ২০১৪ সালে মূলত উত্তরপ্রদেশে বিপুল জয়ই বিজেপি তথা এনডিএ-র সামনে দিল্লির দরজা খুলে দিয়েছিল। ৮০ আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ৭৩টি আসনে; কিন্তু এবার সেই উত্তরপ্রদেশেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেতে চলেছে বিজেপি। আসন সংখ্যা ৭৩ থেকে নেমে আসতে পারে ২৭টিতে। তবে একটি ক্ষেত্রে বিজেপি এখনো স্বস্তিতে রয়েছে। তা হলো প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে রাহুল গান্ধীর চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন নরেন্দ্র মোদী। জনমত জরিপে দেখা গেছে, মোদীর পক্ষে ভোট পড়েছে ৪৪ শতাংশের কিছু বেশি। রাহুলের পক্ষে ভোট ৩০ শতাংশের কিছু কম। যদিও এই ধরনের জনমত সমীক্ষার ফলাফল সব সময় ঠিক হয় না। তবে ভোটারদের মনোভাবের কিছুটা ইঙ্গিত মেলে।