পুরাকীর্তি

অজন্তা ও ইলোরা

প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি আগে নির্মিত অজন্তা ও ইলোরা গুহাসমূহ কেবল অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, এগুলি ভারতের প্রাচীন সমৃদ্ধির একমাত্র সংরক্ষিত নিদর্শন। অজন্তা ও ইলোরা গুহায় আঁকা ছবিগুলো এখনো পর্যন্ত টিকে থাকা প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলার সবচেয়ে শৈল্পিক নমুনা হিসেবে বিবেচিত হয়। অজন্তা এবং ইলোরা মূলত দুটি আলাদা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। এরমধ্যে অজন্তা গুহাসমূহ ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের আওরঙ্গবাদ জেলার অজন্তা গ্রামের পাশেই পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতক থেকে ৭ম শতকের মধ্যে অজন্তার ওয়াগোরা নদীর ২৫০ ফুট উঁচু গভীর খাড়া গিরিখাতের পাথর খোদাই করে তৈরি করা হয়েছিল। ১৮১৯ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ব্রিটিশ সেনা অফিসার জন স্মিথ জঙ্গলে বাঘ শিকার করতে গিয়ে অজন্তা গুহার সন্ধান পান। অজন্তায় রয়েছে ৩০টি গুহা যেগুলো প্রধানত তীর্থস্থান ও বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হতো। মৌর্য আমলে তৈরিকৃত এ গুহাগুলোর মধ্যে পাঁচটি চৈত্যগৃহ এবং বাকিগুলো বৌদ্ধবিহার হিসেবে ব্যবহূত হতো। গুহাগুলোতে শিল্পীরা রীতিমত পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে গুহার দেয়ালে ফুটিয়ে তোলেন তাঁদের শিল্পকর্ম যা মানব সভ্যতার শিল্পকলার ইতিহাসের এক অনন্য সম্পদে পরিণত হয়। এতে তুলে ধরা হয়েছে গৌতম বুদ্ধের পূর্বজন্মের জীবনকাহিনি, গবেষকরা মনে করেন বৌদ্ধ ধর্মকেন্দ্রিক এই চিত্রকর্মগুলো পরবর্তীতে ভারতীয় চিত্রকলাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। অজন্তার গুহাগুলোতে ধর্মীয় নিদর্শন ছাড়াও সেই সময়কালীন প্রাকৃতিক পরিবেশ, পশুপাখি, সাধারণ জনজীবন, রাজ দরবার ও অতীতের বর্ণনা পাওয়া যায়। অজন্তায় গুহাচিত্রের জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে তা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের গুহাচিত্রের পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পাহাড় কেটে কিভাবে এই মন্দিরগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল তা আজও স্থাপত্যজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক বড় বিষ্ময়। ৪৮০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট হরিসেনার রাজত্বের অবসান হলে মন্দিরগুলো ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়। বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে যায় এই অতুল কীর্তি। অরণ্য গ্রাস করে নেয় পুরো এলাকা। বিরল গুহা চিত্রের জন্য  অজন্তা ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

স্থাপত্যশৈলী, নির্মাণ প্রভৃতির কারণে আলাদা হওয়া সত্ত্বেও অজন্তা-ইলোরা একই সঙ্গে উচ্চারিত হয়। অজন্তা গুহা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত প্রাচীন ভারতের আরেক অনন্য সৌন্দর্যময় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ইলোরা গুহা।

মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গবাদ শহর থেকে ৩০ কিমি উত্তরে অবস্থিত ইলোরা গুহাসমূহ ভক্তক, ত্রৈকুটক, কালাচুরি, চালুক্য, রাষ্ট্রকূট ও যাদব রাজবংশের সময়ে তৈরি করা হয়। চরনন্দ্রী পাহাড় কেটে ইলোরা গুহা মন্দিরগুলো তৈরি করা হয়েছিল। ইলোরাতে রয়েছে প্রচুর স্মৃতিসংবলিত ১০০ টি গুহার সারি, যার মধ্যে ৩৪ টি গুহা সবচেয়ে বিখ্যাত এদের স্থাপনার জন্য।  গ্রানাইড পাথরের এই পাহাড়ের ৩৪টি গুহার মধ্যে ১৭টি হিন্দু ধর্মের, ১২টি বৌদ্ধ ধর্মের এবং ৫টি জৈন ধর্মের মন্দির রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর গুহাটির নাম কৈলাসনাথ মন্দির যেটি একটি হিন্দু গুহা, দেখতে অনেকটা বহুতল মন্দিরের মত, একটিমাত্র পাথরকে কেটে এটি তৈরি করা হয়েছিল। এই গুহায় বহু হিন্দু দেবতা এবং পৌরাণিক মূর্তি খোদাই করা আছে। অষ্টম শতাব্দীতে রাষ্ট্রকূটদের রাজত্বকালে এই মন্দিরটি নির্মান করে হিন্দু দেবতা শিবের নামে উত্সর্গ করা হয়। এছাড়াও ইলোরাতে রয়েছ খোদাইকৃত বহুতল বাসভবন, মন্দির এবং রান্নাঘর। ভূতত্ত্ববিদদের মতে প্রাচীন আগ্নেয়গিরির উদ্গীরনের ফলে এই পাহাড়ি অঞ্চল বিভিন্ন শিলা স্তরে গঠিত। খুবই মজবুত পাথর হওয়ায় গুহা নির্মানসমূহ দীর্ঘকাল ধরে টিকে রয়েছে। শিলা কেটে তৈরি ইলোরা গুহাগুলোতে অজন্তার মতো ছবির অভাব থাকলেও অসাধারণ সব ভাস্কর্য তার অভাব পূরণ করে দিয়েছে। অজন্তা গুহার মত ইলোরা কখনো লোক চক্ষুর অন্তরালে যায়নি।

বিভিন্ন লেখা ও ভ্রমণকাহিনী থেকে জানা যায়, নিয়মিত পরিদর্শন হত ইলোরা গুহা। ত্রয়োদশ শতকে প্রথমবার এবং পরে মুঘল শাসক আওরঙ্গজেবের রোষানলে অনেকখানি ধ্বংস হয় ইলোরার মন্দিরগুলো। অজন্তা গুহার মত ইলোরাও ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদায় ভূষিত।

এইচ এম নাজমুল আলম