স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের সঙ্গী, সহচারী, সহযাত্রী। একজন আরেক জনের সঙ্গে পবিত্র কালেমার বাঁধনে বাঁধা। দুটি মনের একটি আত্মা, একটি বন্ধন। একজন আদর্শ স্ত্রী যেমন স্বামীর অহংকার, তেমনি একজন আদর্শ স্বামীও স্ত্রীর অহংকার। স্ত্রীর নিকট আদর্শ স্বামী হওয়াটাও পরম সৌভাগ্যের। তাই আদর্শ স্বামী হতে হলে তার কিছু গুণ থাকতে হবে। স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো সঠিকভাবে পালন করতে হবে। স্ত্রীর সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে, মিষ্ট ভাষায় কথা বলতে হবে। সর্বোপরি, অন্তর থেকে স্ত্রীকে ভালোবাসতে হবে। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেন, ‘তোমরা তাদের (স্ত্রী) সঙ্গে উত্তম আচরণ করো। আর যদি তাকে তোমার অপছন্দও হয়, তবুও তুমি যা অপছন্দ করেছ, হয়তো আল্লাহ তাতে সীমাহীন কল্যাণ দিয়ে দেবেন। (সুরা- নিসা, আয়াত-১৯)।
স্ত্রীর প্রতি কোনো রাগ-দ্বেষ করা যাবে না। কারণে, অকারণে গায়ে হাত তোলা যাবে না। এ বিষয়ে রসুল (স) বলেছেন, কোনো মুমিন পুরুষ মুমিন নারীর প্রতি রাগান্বিত হবে না। কেননা যদি তার কোনো কাজ খারাপ মনে হয়, তাহলে তার এমন গুণও থাকবে, যার জন্য সে তার ওপর সন্তুষ্ট হতে পারবে। (সহিহ মুসলিম, ১৪৬৯)।
স্বামীকে অবশ্যই স্ত্রীর প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। তার প্রতি যেসকল দায়িত্ব রয়েছে তা যথাযথভাবে পালন করতে হবে। যেমন— প্রথম দায়িত্ব হিসেবে স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ করতে হবে। মোহরানা পরিশোধ করা অতীব জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা নারীদের তাদের মোহরানা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে পরিশোধ করবে। সন্তুষ্টচিত্তে তারা মোহরানার কিছু অংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করবে।’ (সুরা- নিসা, আয়াত-৪)।
স্ত্রীর থাকার জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেরূপ গৃহে বাস করো তাদেরও (স্ত্রীদের) সেরূপ গৃহে বাস করতে দাও। তাদের কোনো কষ্ট দেবে না, তাদের (জীবন) সংকটে ফেলার জন্য।’ (সুরা-তালাক, আয়াত-৬)। স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্বও স্বামীর।
স্ত্রী ঘরে থাকবে, ইবাদাত করবে আর সন্তানাদি পালন করবে। খুব প্রযোজন ব্যতিরেকে বাইরে বের হবে না। আর চাকরি না করাটাই ভালো। তবে একান্তই যদি করতে হয় পর্দার সহিত করতে হবে। মূলত স্ত্রীর যাবতীয় ভরণপোষণের দায়িত্ব তার স্বামীর। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘পিতার কর্তব্য যথাবিধি তাদের (সন্তান ও তার মায়ের) ভরণপোষণ করা।’ (সুরা- বাকারা, আয়াত-২৩৩)। অন্যত্র রসুল (স) পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, তুমি যখন খাবে, তাকেও খাওয়াবে, তুমি যখন পরিধান করবে, তাকেও পরাবে। তার চেহারায় কখনো প্রহার করবে না। তার সঙ্গে অসদাচরণ করবে না। (আবু দাউদ- ২১৪২, মুসনাদে আহমদ-১৮৫০১)। স্ত্রীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। স্ত্রীর সঙ্গে কখনো খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তাদের সঙ্গে সত্ভাবে জীবন যাপন করবে।’ (সুরা-নিসা, আয়াত-১৯)। আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেন, ‘তোমাদের আদেশ করা হচ্ছে, তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। কেননা, বুকের হাড় থেকে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। সবচেয়ে প্যাঁচানো বা বাঁকানো হচ্ছে বুকের ওপরের হাড়টি। যদি তা সোজা করতে চাও, তাহলে ভেঙে যাবে। আর যদি ছেড়ে দাও তাহলে ওরকম বাঁকা রয়েছে। অতএব, তোমাদের আদেশ করা হচ্ছে, তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (বুখারি হাদিস, ৫১৮৬)।
স্ত্রীদের দিনদার হতে তাগিদ দিতে হবে। নামাজ-কালাম করতে কঠোর আদেশ দিতে হবে। একজন দিনদার স্ত্রী স্বামীর অমূল্য সম্পদ। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ইমানদাররা তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনদের রক্ষা করো (জাহান্নামের) আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা-তাহরিম, আয়াত-৬)।
স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল হতে হবে। রোগে-শোকে তার পাশে থেকে মানসিক সাহস দিতে হবে। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক পবিত্র। তাই দুজন দুজনকে বিশ্বাস করতে হবে। বিশ্বাস ছাড়া কোনো সম্পর্কই টেকে না। স্বামীর যেমন সচ্চরিত্রবান হতে হবে, স্ত্রীকেও তেমন সচ্চরিত্রবান হতে হবে। অহেতুক ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি করা ঠিক নয়। এতে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। স্বামী স্ত্রী পরস্পরের উচিত নিজ নিজ দৃষ্টিকে সংযত রাখা যাতে জিনা-ব্যভিচারের মতো ঘৃণিত কাজে লিপ্ত না হয়। জিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হলেই সংসারে অশান্তি হয়, সন্দেহের রেখাপাত হয় দুটি মনে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যখন তারা এটি শুনল, তখন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা নিজেদের লোকদের সম্পর্কে কেন ভালো ধারণা করল না? কেন তারা বলল না যে, এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ’ (সুরা-নূর, আয়াত-১২)।
স্ত্রীকে সময় দিতে হবে। কাজের ফাঁকেও সময় করে তার সঙ্গে গল্প গুজব করতে হবে। সারা দিনে কাজের ব্যস্ততা থাকতেই পারে। তাই দিনে না পারলেও রাতে কিছু সময় স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করতে হবে, তাকে হাসিখুশি রাখতে হবে। আমাদের প্রিয়নবি হজরত মোহাম্মদ (স)-এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ। তিনি তার বিবিদের সময় দিতেন। তাদের সঙ্গে গল্পগুজব করতেন। এমনকি তিনি স্ত্রীদের সঙ্গে রাত্রিবেলা দৌড় প্রতিযোগিতাও করতেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্য সর্বাধিক ভালো মানুষ তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে।’ (সুনানে তিরমিজি-১১৬২)।
লেখক :সিনিয়র স্টাফ নার্স, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা