পৃথিবীতে কালে কালে অনেক ঘটনা অকস্মাত্ কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই ঘটেছে। ব্যাপ্তি, ভয়াবহতা ও প্রভাবের দিক দিয়ে পুরো বিশ্বকে তোলপাড় করা এসব ঘটনার জের ধরে মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়েছে দীর্ঘদিনের চর্চিত ইতিহাসের পালা বদলের সাক্ষী হওয়ার।
উদাহরণ হিসেবে পরাক্রমশালী সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন, সাধারণ এক যুবকের আত্মহননের জের ধরে ঘটে যাওয়া আরব বসন্ত, ২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ধ্বস, টুইন-টাওয়ার হামলার পর পৃথিবীজুড়ে মাথাচাড়া দেওয়া জঙ্গীবাদের সরুপ উন্মোচন সহ বর্তমানে চলমান করোনাভাইরাস মহামারীর কথাও বলা চলে।
বর্তমানে এসব ঘটনা ব্যাখ্যায় নাসিম নিকোলাস তালেবের ২০০৮ সালে দেওয়া ‘ব্ল্যাক সোয়ান বা কালো রাজহাঁস’ তত্ত্বের অবতারনা করা হয়। এ তত্ত্বটির এরুপ নামকরনের প্রেক্ষাপট হিসেবে নিকোলাস তালেবের যুক্তি ছিলো অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার-উত্তর সময়ে মানুষের দ্বারা সর্বপ্রথম কালো রাজহাঁসের খোঁজ পাওয়ার ঘটনাটির। তার মতে, অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত মানুষ কোনো কালো রাজহাঁস দেখেনি বলে যেমন এর অস্তিত্ত্ব আছে বলে কখনও ভাবনায়ও আনতে পারেনি, তেমনি ভবিষ্যতে বিশ্বে এমন ঘটনাও ঘটা সম্ভব যা মানুষ এখন পর্যন্ত চিন্তা করতে পারছে না।
ফলে কালো রাজহাঁস তত্ত্বটি হলো এমন একটি রূপক, যা একটি আনপ্রেডিক্টেবল ঘটনাকে বর্ণনা করে। আর কোনো বিশেষজ্ঞ যদি ঐ আনপ্রেডিক্টেবল ঘটনাকে বর্ণনা করেও থাকেন, তবে তিনি মূলত একইরকম ঘটনা ঘটার পর তা থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা বা উপলব্ধি থেকেই করে থাকেন।
মোদ্দা কথায় মানুষের ভাবনায়ও আসতে পারেনা এমন কোনো ঘটনা সত্যি সত্যি যখন ঘটে, তখন তার ‘ইন হাইন্ডসাইট‘ বা পট পরিবর্তনের স্বাক্ষী হিসেবে প্রাপ্ত জ্ঞান ছাড়া আসলেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
নিকোলাস তালেব মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ ও শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ নির্ভর জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে তার এ তত্ত্বের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। চেষ্টা করেছেন চিন্তাজগত ও বাস্তবজগতের সুচারু এক মেলবন্ধনের চিত্রাঙ্কন করতে।
তবে এ তত্ত্বের উপর আলোকপাত করে রচিত তার ‘দ্য ব্ল্যাক সোয়ান‘ বইটি পরবর্তীতে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর সারাবিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিরাট ধ্বস নামে। তত্ত্বটি তখন জন্ম দেয় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার।
সেই সময় নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে নিকোলাস তালেব দাবি করেন যে, আমাদের সমাজে প্রচলিত পলিসি এবং করণীয় কাজের অসামঞ্জস্যতাকে রোধ করতে ব্ল্যাক সোয়ান তত্ত্বকে উত্সাহিত করা প্রয়োজন। বর্তমানে মানুষের একটি শিশুর রাসায়নিক কিট নিয়ে খেলার মতো যে ভয়ানক অচৈতন্য অবস্থা বিরাজ করছে, তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে এর বিকল্প নেই।
আবার সংঘাত বা জাতিগত দাঙ্গার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ভবিষ্যতবাণীকে সোয়ান তত্ত্বে ‘পূর্বাভাস বিভ্রাট‘ এবং মানুষের সচেতনতার অভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধ বা সংঘাত মৌলিকভাবে অনির্দেশ্য হিসেবেও দাবি করা হয়েছে আলোচিত এ তত্ত্বে।