পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্পায়নে তৈরি পোশাক খাত

 রেজাউল করিম খোকন

 

শিল্পায়ননির্ভর অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিগত চার দশকে একটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পেছনে আমাদের যে যাত্রা তার মূলে রয়েছে শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ, বিশেষ করে শ্রমনির্ভর ম্যানুফ্যাকচারিং খাত। ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে আমরা দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছি। প্রায় ৪৪ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি মানুষের জীবিকার প্রধান উত্স এই শিল্পের জিডিপিতে অবদান ১১ শতাংশ।

দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে অব্যাহত অবদান রাখার পাশাপাশি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত, শ্রমিকের ক্ষমতায়ন এবং সবুজ শিল্পায়নেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে এই শিল্প। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠান কিউআইএমএ বাংলাদেশের পোশাক খাতকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এথিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্পায়নেও আমাদের গার্মেন্টস খাত অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে আমাদের দেশে ১৪৩টি লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন (লিড) সার্টিফাইড সবুজ গার্মেন্ট কারখানা রয়েছে এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রথম ১০০টি সবুজ কারখানার মধ্যে ৩৯টি এ দেশে অবস্থিত। ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) তাদের লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন বা লিড রেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে পরিবেশবান্ধব স্থাপনার লিড সনদ প্রদান করে থাকে। ক্রম পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনে শিল্পের ভূমিকার বিষয়টিকেও নজর রাখতে হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় পরিবেশ ও জলবায়ুর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণাটি সাম্প্রতিক সময়ে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণা আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে ব্যাপকভাবে চালু হওয়ায় গোটা অর্থনীতিতে এর চমত্কার অনুকূল প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আমাদের গার্মেন্টস খাত থেকে ৫ হাজার কোটি ডলার আয়ের যে রূপকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়নে গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার দ্রুত বিকাশ সবাইকে আস্থাশীল করে তুলেছে। সাভারে রানা প্লাজা ধস কিংবা তাজরিন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল, এর ফলে ভাটা পড়েছিল এ খাতে। বিদেশি ক্রেতারাও আস্থার সংকটে পড়েছিল। বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার পর ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প। পরিবেশবান্ধব টেকসই কারখানা বা ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠায় রীতিমতো তুমুল প্রতিযোগিতা শুরু হয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে। তাজরিন গার্মেন্টসের অগ্নিকাণ্ড এবং রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর বিদেশি ক্রেতারা একের পর এক ক্রয় আদেশ বাতিল করতে থাকে। এমনকি দেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো নন কমপ্লায়েন্স—এমন অভিযোগ এনে সেগুলো বন্ধেরও চাপ দেয়। ইউরোপ ও আমেরিকান ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স বিভিন্ন সময় এখানকার গার্মেন্টস কারখানাগুলো পরিদর্শন করে রীতিমতো আতঙ্ক সৃষ্টি করে উদ্যোক্তাদের মধ্যে। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল করে দেয়। এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের জন্য উদ্যোক্তাদের মধ্যে চরম অস্বস্তি বিরাজ করছিল। পরবর্তী সময়ে শিল্প মালিকদের গঠনমূলক নানা উদ্যোগ গ্রহণের ফলে ক্রমেই সেই অনিশ্চিত অবস্থা কেটে গিয়ে দারুণ চমত্কার এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিকবান্ধব গার্মেন্টস কারখানা প্রতিষ্ঠায় মালিকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা সুফল বয়ে এনেছে, অর্থনীতিতে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে বলা চলে। গার্মেন্টস শিল্পে গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণা নিঃসন্দেহে নতুন জাগরণ সৃষ্টি করেছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে। গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণা দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সন্দেহ নেই। এতে বিদেশি ক্রেতারা অবশ্যই আকৃষ্ট হবেন জোর দিয়ে বলা যায়। রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে যাবে বহু গুণ। বর্তমানে যারা নতুন কারখানা চালু করছেন, তারা গত কয়েক বছরে লব্ধ অভিজ্ঞতার আলোকেই কারখানা স্থাপন করছেন, তা বলাই বাহুল্য। কারণ তারা উপলব্ধি করেছেন ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারখানা না হলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার দেবেন না। তাই উদ্যোক্তারা ব্যবসার আইনকানুনের পাশাপাশি দেশের প্রচলিত বিভিন্ন আইন মেনে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আবার সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্ট না হলে নতুন কোনো কারখানাকে বিজিএমইএ থেকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। এ পর্যন্ত দেশে গড়ে ওঠা ৬৭টি কারখানা গ্রিন ফ্যাক্টরির মর্যাদা লাভ করেছে, যারা বর্তমানে পুরোপুরি উত্পাদনে রয়েছে। এর বাইরে আরো ২৮০টি নতুন কারখানা গ্রিন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। পরিবেশবান্ধব কারখানার বিচারে বিশ্বের শীর্ষ ১০টির মধ্যে সেরা সাতটি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে।

একটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন তাহলো, গ্রিন ফ্যাক্টরি করতে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ দরকার। একটি ফ্যাক্টরি করতে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এর পাশাপাশি জমিও লাগে ৩ থেকে ১০ বিঘা। দেশের এ পর্যন্ত যেসব কারখানা গ্রিন ফ্যাক্টরির খেতাব জিতে নিয়েছে তাদের বেশির ভাগ উদ্যোক্তার বিনিয়োগই ছিল ৫০০ কোটি থেকে ১১০০ কোটি টাকার মধ্যে। গ্রিন ফ্যাক্টরির স্বীকৃতি লাভ করতে হলে একটি প্রকল্পকে ইউএসজিবিসির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ থেকে উত্পাদন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোচ্চ মান রক্ষা করতে হয়। ভবন নির্মাণ শেষ হলে কিংবা পুরোনো ভবন সংস্কার করেও আবেদন করা যায়। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ধরনের গ্রিন ফ্যাক্টরি প্রকল্পের জন্য উদ্যোক্তাকে উত্পাদনের শুরু থেকে কারখানা গুটিয়ে নেওয়া বা ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে হয়।

গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো পরিবেশের সুরক্ষা। পরিবেশবান্ধব, বিদ্যুত্, পানি ও গ্যাস সাশ্রয়ী, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে উত্পাদন প্রক্রিয়া চালু রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হলেও গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে আমাদের গার্মেন্টস খাতকে। অনেক বাধা, বিপত্তি প্রতিকূলতা, ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে আমাদের গার্মেন্টস খাতকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এখন পরিবেশ সুরক্ষার দিকে সবাইকে আলাদা মনোযোগ দিতে হচ্ছে। গার্মেন্টস সামগ্রী ক্রেতা দেশ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, গোষ্ঠী এখন গার্মেন্টস উত্পাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশবান্ধব, শ্রমিকবান্ধব নানা শর্ত আরোপ করছেন। যেসব শর্ত পূরণের মাধ্যমেই কেবল তাদের সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব। আর এজন্য এখন গার্মেন্টস শিল্পে কমপ্লায়েন্সকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। অতীতে এ বিষয়টিকে এক প্রকার অগ্রাহ্য করা হয়েছে। গ্রিন ফ্যাক্টরি ধারণার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার পেছনেও বিদেশি ক্রেতাগোষ্ঠীর চাপ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।