বগুড়ায় করোনা বিশেষায়িত সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলার (উচ্চমাত্রার অক্সিজেন সরবরাহকারী সরঞ্জাম) অভাবে রোগীদের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী উচ্চমাত্রার অক্সিজেন না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৩ ঘণ্টায় সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। আরো অন্তত ১০ জনের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে আরো অর্ধশতাধিক করোনা রোগী মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন ইত্তেফাক প্রতিনিধিরা।
বগুড়া অফিস জানায়, ২০০ শয্যার মোহাম্মদ আলী করোনা হাসপাতালে শুক্রবার সকাল ৭টা পর্যন্ত ২২৩ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। যাদের অধিকাংশেরই উচ্চমাত্রার অক্সিজেন প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতালটিতে বর্তমানে মাত্র দুটি হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা থাকায় দুজনের অতিরিক্ত আর কোনো রোগীকে উচ্চমাত্রার অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যে কারণে যাদের অক্সিজেন স্যাচুরেশন (রক্তে ঘনীভূত অক্সিজেনের মাত্রা) ৮৭ এর নিচে, তাদের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সক শফিক আমিন কাজল জানান, হাসপাতালটিতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ চালু হলেও সবগুলো শয্যায় উচ্চমাত্রার অক্সিজেন সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা যুক্ত করা হয়নি। এমনকি আট শয্যা নিয়ে চালু করা আইসিইউ ইউনিটেও মাত্র দুটিতে হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা রয়েছে। ফলে পুরো হাসপাতালের মধ্যে আইসিইউ ইউনিটের ঐ দুটি শয্যায় কেবল উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। অক্সিজেন সংকটের কারণে সাত জনের মৃত্যুর তথ্যটি তিনি নিশ্চিত করেছেন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বগুড়ার তিন হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে শ্বাসকষ্টে থাকা রোগীদের জন্য হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা আছে মোট ২৩টি। এর মধ্যে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে দুটি, শজিমেক হাসপাতালে ১১টি এবং বেসরকারি টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০টি।
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-শজিমেক সূত্রে জানা গেছে, এখানকার করোনা ইউনিটে ৮৭টি সাধারণ শয্যা, আটটি আইসিইউ শয্যা ও পাঁচটি এইচডি ইউনিটসহ মোট ১০০টি শয্যা রয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন শতাধিক রোগী। হাসপাতালের উপপরিচালক আবদুল ওয়াদুদ বলেন, করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি সিংহভাগ রোগীকেই অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। অথচ গোটা হাসপাতালে হাইফ্লো নাজাল ক্যানোলা আছে মাত্র ১২টি।
বগুড়ার সিভিল সার্জন গউসুল আজিম চৌধুরী বলেন, গত বছর মোহাম্মদ আলী হাসপাতালকে করোনা বিশেষায়িত ঘোষণা করার সময় আইসিইউ ও কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা কোনোটাই ছিল না। পরে আট শয্যার আইসিইউ চালু করা হয়। কিন্তু হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলার বরাদ্দ মিলেছে মাত্র দুটি। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ক্যানোলা বরাদ্দ চেয়ে দফায় দফায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো বরাদ্দ মেলেনি।
খুলনা অফিস জানায়, মৃত্যুর মিছিল থামছেই না খুলনা বিভাগে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ বিভাগে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরো ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২০১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রাশেদা সুলতানা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে খুলনা বিভাগে গত বৃহস্পতিবার করোনায় সর্বোচ্চ ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে খুলনায় ৯ জন, কুষ্টিয়ায় সাত জন, ঝিনাইদহে তিন জন, চুয়াডাঙ্গায় তিন জন, যশোরে দুই জন, বাগেরহাট, নড়াইল ও মেহেরপুরে এক জন করে মারা গেছেন। গতকাল সকাল পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছে ৫৮ হাজার ৭২১ জন। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১ হাজার ১৩৬ জন।
এদিকে খুলনা অঞ্চলে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় করোনা হাসপাতালে রোগীর চাপ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। ফলে চরম শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। রোগীর চাপ সামলাতে শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে নতুন করে ৪৫ শয্যার করোনা ইউনিট চালুসহ আরো ১১৫ শয্যা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের প্লাস্টিক অ্যান্ড বার্ন ইউনিটে ২০টি, ফিজিক্যাল মেডিসিনি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগে ১৫টি ও চতুর্থ তলার আইসিইউ বিভাগে ১০টি বেড করোনার রোগীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. এস এম মোর্শেদ জানান, শনিবার থেকেই করোনা পজিটিভ রোগীদেরই শুধু এখানে ভর্তি করা হবে। আপাতত যে জনবল আছে তা দিয়েই করোনা ইউনিটের যাত্রা শুরু হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আরো কিছু জনবল চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
অন্য দিকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিচালিত ‘ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল’কে ১০০ শয্যা থেকে ১৩০ শয্যায় রূপান্তরিত করা হয়েছে। খুলনা জেনারেল হাসপাতালে ৭০ শয্যার করোনা ইউনিট চালু করা হয়েছে। তার পরও রোগীর চাপে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
রাজশাহী স্টাফ রিপোর্টার জানান, রাজশাহী বিভাগে করোনার সংক্রমণ কিছুটা কমলেও মৃত্যু কমছে না। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন জেলায় করোনায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের ১২ জনই বগুড়ার জেলার বাসিন্দা। এছাড়া রাজশাহীর ৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১ ও নওগাঁর ৩ জন রয়েছে। এ নিয়ে বিভাগের আট জেলায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৯১০ জনে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে করোনা সংক্রমিত হয়েছে ৮৫১ জনের শরীরে। দুপুরে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সূত্র মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছে পাবনায় ২৪৪ জন। এছাড়া রাজশাহীতে ২৪১ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪০ জন, নওগাঁয় ৪৯ জন, নাটোরে ৭৮ জন, জয়পুরহাটে ৩১ জন, বগুড়ায় ১০০ জন ও সিরাজগঞ্জে ৬৮ জন আক্রান্ত হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগে মোট আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়াল ৫৭ হাজার ৮৮৪ জন।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানিয়েছেন, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছেন ৭৬ জন। হাসপাতালের ৪০৫ বেডের বিপরীতে করোনা ও উপসর্গের রোগী ভর্তি রয়েছেন ৪৬৮ জন। অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থা করে রোগীদের চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে।