যমুনার সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে আশঙ্কাজনক পানি বৃদ্ধি

ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চলতি সপ্তাহে স্বল্পমেয়াদি বন্যা এগিয়ে আসছে বলে জানিয়েছে পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র। কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো কয়েক দিনের মধ্যে প্লাবিত হবে। মধ্যমেয়াদি বন্যার শঙ্কার কথাও জানান তিনি।

তিনি জানান, আগামী ১০ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত আসামে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এসব কারণে পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে দ্রুত বাড়ছে। আশঙ্কাজনকভাবে ৩৬ ঘণ্টায় পানি ৫৭ সেন্টিমিটার বেড়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে নদীর হার্ডপয়েন্ট এলাকায় পানির গভীরতা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ০৫ সেন্টিমিটার। পাউবো সিরাজগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে আগামী এক সপ্তাহ পর্যন্ত পানি বাড়ার গতি অব্যাহত থাকবে। এ সময়ের মধ্যে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করে বন্যা হবে।

ফেনীর মুহুরী নদীর বাঁধ ভেঙেছে তিন জায়গায়। এতে তলিয়ে গেছে ১০টি গ্রাম। শেরপুরে ৫০ গ্রামে ঢুকেছে পানি। টানা বর্ষণে জলাবদ্ধ ময়মনসিংহের দুই উপজেলা। দেশের পূর্বাঞ্চলীয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের বায়েক ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে। টানা বর্ষণে প্লাবিত ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার ৩৫ গ্রাম। পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে কৃষিজমি। ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া, গামারিতলা, ঘোষগাঁও এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও বাড়ছে ধোবাউড়া সদর, বাঘবেড়, পোড়াকান্দুলিয়া, গোয়াতলা এলাকায়। ঘরবাড়ি ছেড়ে দূরবর্তী স্থানে আত্মীয়র বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন অনেকে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাফিকুজ্জামান বলেন, বাঁধ ভেঙে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অন্তত ৩৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ত্রাণ কার্যক্রম চলছে।

হঠাত্ তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙনের মুখে পড়ে লালমনিরহাটের সলেডি স্প্যার বাঁধ-২। গতকাল শুক্রবার বাঁধটি পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবু জাফর। স্থানীয়রা জানায়, তিস্তা নদীর দুই কূল উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। গত ২৪ ঘণ্টায় সলেডি স্প্যার বাঁধ-২ এর উজানে চৌরাহা মাদ্রাসা এলাকায় বসতভিটা ও কয়েক একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে শত শত বসতবাড়ি। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তরা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায় অতি বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যাকবলিত এলাকার পানি ধীরগতিতে নামছে। দুর্গতদের জন্য হালুয়াঘাটের সেন্ট এন্ডুজ ও মেরি উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে প্রশাসন।

কুড়িগ্রামে কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমারসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে পরশুরামে কহুয়া নদীর দুইটি স্থানে বাঁধ ভেঙে বন্যা কবলিত হয়েছে।

ফেনীর জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান জানান, প্রয়োজনে বন্যাকবলিত এলাকায় লকডাউন কিছুটা শিথিল করা হবে যাতে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী জহির উদ্দিন জানান, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ভাঙা স্থানগুলোতে মেরামত করা হবে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, আগামী দুই দিনে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা এবং পার্বত্য অঞ্চলের প্রধান নদ ও নদীগুলোর পানি সমতল দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কিছু স্থানে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এদিকে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সমতল স্থিতিশীল আছে, অন্যদিকে যমুনা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। উভয় নদ ও নদীর পানি সমতল আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে, গঙ্গা নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে যা আগামী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। অপরদিকে পদ্মা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। সুরমা ছাড়া দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ ও নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে যা আগামী ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও ভারত আবহাওয়া অধিদপ্তরের গাণিতিক মডেলের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং এর কাছাকাছি ভারতের হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা প্রদেশে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস আছে। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আপার মেঘনা অববাহিকা এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য অববাহিকার প্রধান সব নদ ও নদীর পানি সমতল সময় বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কিছু স্থানে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।