বর্ষায় অত্যন্ত চেনা দৃশ্য হচ্ছে জলাবদ্ধতা। বৃষ্টির ফলে গ্রামে-গঞ্জে যে জলাবদ্ধতা হয়, সে কথা বলছি না। বলছি, আমাদের রাজধানী ঢাকার কথা। প্রতি বছর বর্ষার সময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় জলাবদ্ধতা। বছরের পর বছর প্রতিকার ও ব্যবস্থার কথা বলা হলেও রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হচ্ছে না। একটু ভারি বৃষ্টি হলেই রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক ডুবে যায়। অনেক বাড়ির দোরগোড়ায়ও জমে থাকে হাঁটুপানি। এই জলাবদ্ধতার দুর্ভোগের মধ্যেই অফিসসহ নিত্যদিনের কাজ করতে হয় নগরবাসীকে। সামান্য বৃষ্টিতে বেশিরভাগ সময়ই মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা, মগবাজার, মালিবাগ, তেজগাঁও, শান্তিনগর, পুরান ঢাকা, খিলক্ষেতসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা একটি নিয়মিত চিত্র। বেশিরভাগ রাস্তায়ই প্রায় হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে থাকে। পানিতে তলিয়ে যাওয়া রাস্তার যানজট পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমসিম খেতে হয় ট্রাফিক সদস্যদের। দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে অফিসমুখী যাত্রীরা পড়েন বিড়ম্বনায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এতদিন ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসার ওপর। গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে দুই সিটি কর্পোরেশনকে এ দায়িত্ব দেয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর সিটি কর্পোরেশন পানি নিষ্কাশনের জন্য কয়েকটি খালকে আবর্জনামুক্ত করে পানিপ্রবাহের ব্যবস্থা করে। তাছাড়া কয়েকটি বক্স কালভার্ট থেকেও বর্জ্য অপসারণ করা হয়। কিন্তু এতে কয়েকটি এলাকায় কিছুটা সুফল হলেও ভারি বৃষ্টিপাতে তেমন কোনো কাজে আসে না। জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই পায় না এলাকাবাসী। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ভারি বর্ষণ হলেই রাজধানীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। কর্তৃপক্ষ এ জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন আশ্বাস দিলেও তা যথার্থভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের পথগুলো আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকায় দ্রুত পানি নামতে পারে না। আর তাই প্রতিবারই এমন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার পানি সরে যাওয়ার কোনো পথই খোলা নেই।
বৃষ্টির পানির এ জলাবদ্ধতায় আবারও সামনে ওঠে আসছে ঢাকার খালের কথা। খালগুলো ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি হওয়ার ফলে বৃষ্টির পানি সেই খালে সরতে পারছে না। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় এখন কাগজে-কলমে মাত্র ২৭টি খাল রয়েছে। একসময় এই খালের সংখ্যা ছিল ১১৭টি। জানা যায়, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে বৃষ্টির পানি সরানোর জন্য আছে ২৫ হাজার কিলোমিটার খোলা ড্রেন এবং ৪ হাজার কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ ড্রেন। কিন্তু এসব ড্রেন পরিষ্কার থাকে না। ৪০ ভাগেরও বেশি ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে এসব ড্রেনে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকায় প্রতিদিন ১৫ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য উত্পাদিত হয়, যার একটি বড় অংশ এসব ড্রেনে প্রবেশ করে। অন্যদিকে, ঢাকায় কংক্রিটের স্থাপনা আছে ৮৫ ভাগের মতো। এর ফলে ৯০ ভাগ পানি ড্রেনে চাপ সৃষ্টি করে এবং এ চাপ নেওয়ার মতো অবস্থা ড্রেনগুলোর নেই। অর্থাত্ খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে, স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি। আর এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে আমাদের দ্বারাই।
সাধারণভাবে ঘণ্টায় ৪০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি না হলে ঢাকায় জলাবদ্ধতা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এখন দেখা যায়, ঘণ্টায় মাত্র ১০ মিলিমিটার সাধারণ এবং স্বাভাবিক বৃষ্টিতেই ডুবে যায় ঢাকা শহর, যেখানে প্রায় দেড় কোটি মানুষের বসবাস। বিশেষজ্ঞমহল মনে করেন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য প্রাকৃতিক আধারগুলোকে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। এজন্য নদী-খাল দখলমুক্ত করে পানি নিষ্কাশনের সহজ ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করারও প্রয়োজন রয়েছে।
n লেখক : নিবন্ধকার