রাজধানীর অদূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হাসপাতালে সব ধরনের অবকাঠামো রয়েছে; কিন্তু যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই চিকিত্সা সেবা নেই এখানে। এনেসথেসিওলজিস্ট না থাকায় অপারেশন বন্ধ। চিকিত্সক পদ ১৭টি, অথচ আছেন মাত্র ৪ জন ডাক্তার। তারাও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। গতকাল শনিবার ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি সরেজমিন গিয়ে দেখেন, জরুরি বিভাগে আহত এক শিশুর সেলাই করছেন শফিকুল ইসলাম নামক একজন সুইপার। সময় তখন দুপুর দেড়টা, জরুরি বিভাগে সে সময় কোনো ডাক্তার নেই।
শিশুটির সেলাই শেষ হওয়ার পর আসেন জরুরি বিভাগের চিকিত্সক। হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। ভেতরে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। এসব থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় টেকা যায় না। এ অবস্থার মধ্যেই জরুরি, বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে রোগীদের চিকিত্সা নিতে হচ্ছে। রাজধানীর পাশেই রূপগঞ্জ উপশহরে স্বাস্থ্য সেবার এই বেহাল দশা, তাহলের সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবার কী অবস্থা সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
দেশের অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা সেবার করুণ অবস্থা বিরাজ করছে। সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালকরা (স্বাস্থ্য) সঠিকভাবে মনিটরিং করেন না। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সমন্বয়ে একটি ভিজিল্যান্স টিম আছে। তাদের কাজ হলো সরেজমিন পরিদর্শন করা এবং সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালকরা (স্বাস্থ্য) ঠিক মতো কাজ করছেন কিনা তা দেখা। একই সঙ্গে চিকিত্সকরা কর্মস্থলে আছেন কিনা সেটিও মনিটরিং করার দায়িত্ব ভিজিল্যান্স টিমের। কিন্তু তারাও মনিটরিং করে না।
১৯৭২ সালের ১০ ডিসেম্বর তত্কালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আব্দুল মালেক উকিল রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করেন। বর্তমানে এই হাসপাতালে ৭ জন ডাক্তরের মধ্যে তিন জনকে অন্যত্র করোনা চিকিত্সা সেবা দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরমধ্যে একজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, একজন মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং আরেকজন ডাক্তার নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালে করোনা চিকিত্সা সেবায় কর্মরত আছেন।
গতকাল ইত্তেফাকের প্রতিনিধি এই হাসপাতালে সরেজমিনে পরিদর্শনের আগে রূপগঞ্জ ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে যান। তখন দুপুর পৌনে ১টা। সেই সময় উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি তালাবদ্ধ ছিল। পাশে থাকা সাত সিএনজি অটোরিকশা চালক ও দোনকদার বলেন, অধিকাংশ সময় ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি বন্ধ থাকে। দায়িত্বরতরা মনে করলে আসেন। এক থেকে দেড় ঘণ্টা থেকে তারা চলে যান।
পরে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। শীতলক্ষ্মা নদীর পাশে উপজেলা সংলগ্ন এই হাসপাতালটির বাইরের পরিবেশ চমত্কার। সামনে নদী, পিছনে গাছ-গাছালি। তবে হাসপাতালের ভিতরে যে কেউ প্রবেশ করা মাত্রই নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখতে পাবেন। চারপাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। আবাসিক এলাকার পরিবেশও নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। এই হাসপাতালে ৮ জন কনসালটেন্টের পদ আছে, কিন্তু কনসালটেন্ট আছেন মাত্র দুই জন। এদের মধ্যে একজন গাইনি ও অন্যজন অর্থপেডিক কনসালটেন্ট।
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা নূরজাহান আরা খাতুন বলেন, এই হাসপাতালে জনবল সংকট আছে। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
হাসপাতালে আগত রোগীরা বলেন, হাসপাতালে আসলে কিছু ওষুধ দেয়। ডাক্তার থাকেন না। ডাক্তাররা থাকেন ঢাকায়। আবাসিকে একজন ডাক্তার থাকেন। ৫০ ধরনের ওষুধ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দেওয়ার কথা থাকলেও ৭/৮ রকমের বেশি ওষুধ দেওয়া হয় না বলেও রোগীরা অভিযোগ করেন।
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীনে ৯টি ইউনিয়ন উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের এসব স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে ৩০ থেকে ৪০ ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। ইউনিয়ন উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে একজন মেডিক্যাল অফিসার থাকেন। এছাড়া ওয়ার্ড পর্যায়ে রয়েছে ৪১টি হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক। সারাদেশে আছে ১৩ হাজার ৭০০ হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক। ৩০ ধরনের ওষুধ সেখান থেকে দেওয়া হয়। হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর দায়িত্বে থাকেন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার। ২০০৯ সালে এ যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল হাতের কাছে মানুষের প্রাথমিক চিকিত্সা সেবা পৌঁছে দেওয়া।
আরসিএইচসিআইভি প্রকল্পের অধীনে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো চালু করা হয়। এই প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাখদুমা নার্গিস বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০টি অগ্রাধিকার প্রকল্পের একটি হলো হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক। উদ্দেশ্য ছিল মানুষ প্রাথমিক চিকিত্সা সেবা যেন হাতের কাছে পান।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের এই স্বাস্থ্য সেবা অবকাঠামো সচল থাকলে এবং সঠিকভাবে কাজ করলে সাধারণ রোগীদের পাশাপাশি করোনা রোগীরাও সুচিকিত্সা পেতেন। কারণ জ্বর, সর্দি, কাশি ও গলায় ব্যথা-করোনার এসব উপসর্গভিত্তিক চিকিত্সা দিলে ৯০ ভাগ মানুষ সুস্থ হয়ে যায়। অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকায় গ্রামের অনেক মানুষ হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক কী সেটিই জানেন না।
সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালকরা (স্বাস্থ্য) এসব সঠিকভাবে মনিটরিং করেন না। নিয়মিত মনিটরিং করলে এসব অবকাঠামো সচল থাকতো বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামের একদম হাতের কাছে করোনাসহ সব ধরনের রোগের প্রাথমিক চিকিত্সা রয়েছে। এই চিকিত্সা সেবা সঠিকভাবে চললে গ্রামে থেকে ৯০ ভাগ রোগীর রাজধানীসহ শহর এলাকায় আসার প্রয়োজন হতো না।