সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা পদত্যাগ দাবি

শেষ হলো বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশন, যা ছিল বাজেট অধিবেশন। করোনার মহামারিকালে দ্বিতীয় এই বাজেট অধিবেশনে ‘তোপে পড়ার’ কারণে হয়তো মনে রাখবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। মহামারিকালে স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা আর অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে দফায় দফায় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু হতে হয়েছে তাকে। ১২ কার্যদিবসের এই অধিবেশনের ৯ দিনই বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তাকে তোপ দাগিয়েছেন।

গতকাল শনিবার অধিবেশনের সমাপনী দিনও সুখকর হয়নি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জন্য। শেষ দিনে জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান মুজিবুল হক চুন্নু বললেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কী মানুষ? বুঝলাম না। ওনার লজ্জা-শরম কিছু নাই। চরিত্র নাই। ওনার রিজাইন (পদত্যাগ) দেওয়া উচিত।’ বিরোধী দলের আরো কয়েক জন সদস্যও গতকাল পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে অক্সিজেনের অভাবে সাতক্ষীরা ও বগুড়ায় মৃত্যু, আইসিইউ-হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার সংকট, ৩৭টি জেলায় অক্সিজেন না থাকা, স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং হাসপাতালে না গিয়ে শুধু জুম মিটিং করায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে তুলোধুনা করেছেন। অবশ্য গতকাল সংসদে যাননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় সংসদে ছিলেন।

পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে অনির্ধারিত এই আলোচনা শুরু করেন বগুড়ার বিএনপি দলীয় এমপি জি এম সিরাজ। তিনি বলেন, বগুড়া কোভিডের হটস্পট। বগুড়ায় দুই দিনে ২৪ জন মারা গেছেন। মৃত্যুর কারণ হলো উচ্চমাত্রার অক্সিজেন সরবরাহের জন্য হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলার সংকট। তিনি বলেন, কোভিডের জন্য নির্ধারিত মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল ২৫০ বেডের। এর মধ্যে আইসিইউ বেড আছে আটটি। কিন্তু হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা আছে মাত্র দুটি। তাই বাকি আইসিইউ বেড কোনো কাজেই লাগছে না। তিনি জানান, বগুড়ায় তিনটি হাসপাতালের ৪৫০টি বেড রোগীতে ঠাসা। নতুন রোগী ভর্তি হতে পারছেন না। বগুড়ার প্রতিটি হাসপাতালে ২০টি হাই ফ্লো অক্সিজেন সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলের উপনেতা জি এম কাদের অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বছর আগে যে অবস্থায় ছিল, এখনো সেখানেই আছে। কোনো উন্নতি হয়নি। আমি আমার নিজ এলাকার হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য বহুবার চিঠি দিয়েছি, সংসদে বক্তব্য দিয়েছি। তবে এগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে আমি ছয়-সাত বার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। মন্ত্রীর সহকারীদের ফোন করার পর মন্ত্রীকে জানানোর কথা বলি। কিন্তু মন্ত্রী ফোন করেন না। ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আমাদের চেয়ে ভালো। এর পরও তারা নাজেহাল হয়েছে। আমাদের  দেশে ভারতীয় ভেরিয়েন্ট সেভাবে ছড়িয়ে পড়লে আশঙ্কা করার অনেক কারণ আছে।’

গত বুধবার সংসদে বাজেট পাশের সময় বিরোধী সংসদ সদস্যদের সমালোচনার মুখে স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। জেলা হাসপাতালের সভাপতি সংসদ সদস্যরা উল্লেখ করে ঐ দিন এমপিদের ওপর দায় চাপান মন্ত্রী।

বিষয়টি টেনে বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, গত বুধবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছেন, এর মাধ্যমে গোটা হাউজকে অপমান করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেছিলেন, এমপিরা জেলা হাসপাতালের চেয়ারম্যান। তারা দায়িত্ব পালন করেন না। মন্ত্রীর এই বক্তব্য ঠিক নয়। এই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করা দরকার। তিনি বলেন, সংসদে ৯০ ভাগ এমপি সরকারি দলের। তাহলে কি সরকারি দলের এমপিরা দায়িত্ব পালন করছেন না? হারুন বলেন, আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে করোনা পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। অক্সিজেনের সংকট দেখা দিয়েছে। এটা দেখতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে খাদ্যসহায়তা দিতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যগ দাবি করে জাপার মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আনন্দে আত্মহারা হয়ে একটি কিস করার কারণে তাকে রিজাইন দিতে হয়েছে। পত্রিকায় এত লেখালেখি হচ্ছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একটি হাসপাতালে গিয়ে এগুলো দেখেছেন? তিনি কী করেন? তিনি শুধু জুম মিটিং করেন। মন্ত্রী আমেরিকার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আমাদের দেশে আমেরিকার চেয়ে কম লোক মারা যায়। এটা কি তার কৃতিত্ব? এক বছর মন্ত্রী কী করলেন? ৩৭টি জেলায় অক্সিজেন নেই। মানুষ মারা যাচ্ছে। তিনি (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) বললেন, এক বছরে নাকি অনেক কাজ করেছেন। হাসপাতালে পাঁচ জন রোগী অক্সিজেন পান তো ২০ জন লাইনে থাকেন। কেবল অক্সিজেনের অভাবে মানুষ ছটফট করে মারা যাচ্ছেন।’

জাপার কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ অনির্ধারিত এই আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘সাতক্ষীরায় অক্সিজেনের অভাবে এক ঘণ্টায় সাত জন ছটফট করে মারা গেলেন। নার্স, ওয়ার্ডবয় ও চিকিত্সকেরা কী করলেন? এই সাতক্ষীরা হলো আগের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক সাহেবের এলাকা। এখানে তো ফাইভস্টার হাসপাতাল হওয়া উচিত। অক্সিজেনের অভাবে কীভাবে রোগী মারা যায় বুঝি না। মন্ত্রীরা যান-আসেন, নিজের এলাকাটাও ঠিক রাখতে পারেন না! এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আইসিইউ, এসডিইউতে রোগী গেলে কোনো চিকিত্সা হয় না। সেখানে কী হয়, কেউ জানে না। মানুষের মৃত্যুর কি কোনো দাম নেই! একটা তদন্ত কমিটি করুন। এর প্রতিবেদন প্রকাশ করুন।’

ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘অক্সিজেন প্ল্যান্ট করা অত্যন্ত সেনসেটিভ কাজ। সুদক্ষ ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা সঠিক ডিজাইন করে অক্সিজেন প্ল্যাট বসাতে হয়। অক্সিজেন সাপ্লাই লাইনে সঠিক ডাইমেনশন থাকতে হবে। এখানে যদি কোনো লিকেজ থাকে, তাহলে আগুন ধরে যাবে। মন্ত্রী সাহেব সেটা ভালো করে জানেন। সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেল। ঠিক আছে, আপনি ম্যানুয়াল করতেন। সিলিন্ডার মুখে দিলে জীবনটা তো বাঁচত কিছুক্ষণের জন্য। পারলেন না। আমরা তো রোগী আইসিইউতে ঢুকিয়ে দিই। যাওয়ার পর কী চিকিত্সা হয় কেউ খবর রাখে না। ঐখানে অধিকাংশ রোগী অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে। বলে যে রোগীর অবস্থা খারাপ। ভেন্টিলেশন দিচ্ছি। এক ঘণ্টা পর বলে রোগী মারা গেছে, নিয়ে যান। আসলে কোনো চিকিত্সা হয় না।’

জাপার জ্যেষ্ঠ এই এমপি আরো বলেন, ‘একটা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজ পর্যন্ত আমাদের সামনে এলো না। সারা পৃথিবীতে মানুষ মারা যাচ্ছে, কিন্তু এভাবে চিকিত্সা দিতে গিয়ে এ ধরনের অনিয়ম মানা যায়? অনেক কিছু নাকি দিল। একটা হাসপাতালে অক্সিজেন নেই। হাই ফ্লো ক্যানুলা নেই। বগুড়া হাসপাতালে অক্সিজেনই নেই। জিজ্ঞেস করলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলে, সব দিচ্ছি—কোথাও কিছু দেয়নি। এভাবে একটা বছর সময় নষ্ট করেছি। এক বছরের মধ্যে হাসপাতাল ওয়েল ইকুইপড করতে পারতাম। আমাদের এমপিদের দায়িত্ব দিত, সবকিছু করে দিতে পারতাম। কিন্তু দায়িত্ব না দিয়ে আমলাদের দেয়। জবাবদিহি আমাদের করতে হয়।’

জাপার আরেক এমপি ডা. রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ‘বুধবার মাস্কের দুর্নীতির কথা বলার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাস্ক কেনা হয়নি বলে দাবি করেন। আমি আজ তথ্য-প্রমাণ নিয়ে এসেছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের পরিচালক নিজে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বলেছেন, একটি সার্জিক্যাল মাস্ক কেনা হয়েছে ৩৫৬ টাকায়। বিষয়টি দুদকে গেছে। পত্রিকায় এসেছে। অথচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই সত্যটা এড়িয়ে গেলেন কেন?’ তিনি সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরার বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

রাঙ্গার টেস্টে দুই রকম ফল, চিন্তায় চুন্নু

গতকাল সংসদে আনা একটি বিল বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে জাপার মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘আমার পাশে যিনি বসেন, আমাদের বিরোধী দলের চিফ হুইপ (মসিউর রহমান রাঙ্গা), তিনি এখন চিকিত্সাধীন আছেন। তিনি কোভিডে আক্রান্ত। আমি ভয়ে ছিলাম। গত বৃহস্পতিবার বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে নমুনা পরীক্ষার পর রাঙ্গার ফল পজিটিভ আসে। বিকালে টেস্টের রিপোর্ট আসে নেগেটিভ। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় রাঙ্গা কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি পজিটিভ না নেগেটিভ? আমি ভয় পাচ্ছি। এখন আমি ভয় পাব কি পাব না, এটাও ঠিক বুঝতে পারছি না। এটা তো একটা সমস্যা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এখানে নেই। এই জিনিসগুলো দেখা দরকার।’