যাচ্ছে বিদেশি সৈন্য আসছে তালেবান

আফগান সরকারের পতন ঘটবে!

 

বাগরাম বিমানঘাঁটি কাবুলের ৪০ কিলোমিটার উত্তরে। এর নামকরণ কাছের একটি গ্রামের নামে। বাগরাম বিমানঘাঁটিটি গড়ে তুলেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, যখন তারা ১৯৮০-র দশকে আফগানিস্তান দখল করে। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী সেখানে যায় ২০০১ সালের ডিসেম্বরে। প্রায় ২০ বছর ধরে এই ঘাঁটি       থেকেই বিদেশি বাহিনী তালেবান এবং আলকায়েদার ওপর হামলা চালিয়েছে। কিন্তু সেই ঘাঁটি ছেড়ে চলে গেছে বিদেশি সৈন্যরা। অন্যদিকে তালেবান বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, ছয় মাসের মধ্যে আফগান সরকারের পতন ঘটে যেতে পারে। যদিও আমেরিকান নেতারা এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কাবুলকে সুরক্ষিত রাখতে এবং তালেবানকে দূরে রাখতে আফগান সরকার কতটা সফল হয়, তা নির্ভর করবে দেশটির সরকার বাগরামের নিয়ন্ত্রণ কতটা বজায় রাখতে সক্ষম হয় তার ওপর। এখন তালেবানের টার্গেট থাকবে এ বাগরামের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।

 

পতন ঘটবে ঘানি সরকারের!

আমেরিকার গোয়েন্দাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ছয় মাসের মধ্যে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি সরকারের পতন ঘটতে পারে। জেনারেল অস্টিন স্কট মিলার কিংবা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও আফগান সরকারের টিকে থাকা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেননি। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে বাইডেন বলেননি যে আফগান সরকার টিকে থাকবে। শুধু বলেছেন, টিকে থাকার সামর্থ্য তাদের আছে। বরং আফগানিস্তানে শীর্ষ মার্কিন জেনারেল অস্টিন নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আফগানিস্তানে তিনটি দৃশ্য দেখা যেতে পারে। প্রথমত, তালেবান এবং আফগান সরকার ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তিতে আসতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, তালেবান এবং পশ্চিমা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আফগান বাহিনীর সঙ্গে লড়াই, যা গৃহযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। তৃতীয়ত, আশরাফ ঘানির সরকারকে হটিয়ে তালেবানের ক্ষমতা দখল।

 

পুনরুত্থান ঘটছে তালেবানের

২০ বছর আগে ২০০১ সালে ৯/১১-এর পর আমেরিকা আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়েছিল। তালেবান শাসনের পতন হয়েছিল। টুইন টাওয়ারে হামলার ২০তম বার্ষিকী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী চলে যাবে। ইতিমধ্যেই সেনা সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তাই তালেবান আরো বেশি আক্রমণাত্মক হয়েছে। শক্ত ঘাঁটি দক্ষিণ আফগানিস্তান থেকে তারা উত্তর দিকের এলাকা দখলে নিচ্ছে। তাজিকিস্তান-আফগানিস্তানের সীমান্ত শহর দখল করেছে। উত্তরের আরো দুটি জেলা নাহরিন এবং বাঘলান-ই-মারকাজিও কবজা করেছে। আফগানিস্তানে জাতিসংঘের বিশেষ দূত লিওনস জানিয়েছেন, তালেবান ইতিমধ্যেই ৫০টি জেলা দখলে নিয়েছে। তারা আঞ্চলিক রাজধানীগুলোর দিকে এগুচ্ছে। জাতিসংঘের মতে, তালেবানের এই অগ্রসরে শান্তি প্রক্রিয়া ধাক্কা খাবে। আবার উত্তেজনা দেখা দেবে।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, তারা সেনা প্রত্যাহার করবেন। কিন্তু একই সঙ্গে তারা তালেবান অভিযান নিয়ে সব তথ্য জোগাড় করছেন। প্রয়োজন হলে প্রতিবেশী কোনো দেশ থেকে তারা তালেবানের ওপর আঘাত হানবেন। কিন্তু এই অঞ্চলে নতুন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা কঠিন হবে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া বিরোধিতা করবে। পাকিস্তানও জানিয়েছে, তারা সেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি করতে   দেবে না। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, প্রায়      ৬৫০ জন মার্কিন সৈন্য আফগানিস্তানে থেকে যাবে বলে  ধারণা করা হচ্ছে। তারা কাবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা এবং কূটনীতিকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবে।

যুদ্ধের যত ক্ষয়ক্ষতি

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটি। গবেষণায় দেখা যায়, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ২ লাখ ৪১ হাজার মানুষ মারা গেছেন। দুই দশকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ৭১ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষের প্রাণ গেছে। তাছাড়া ২ হাজার ৪৪২ জন মার্কিন সেনা, প্রতিরক্ষা দপ্তরের ছয় জন বেসামরিক লোক, ৩ হাজার ৯৩৬ জন মার্কিন ঠিকাদার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জোটের ১ হাজার ১৪৪ জন সেনা মারা গেছেন। যুদ্ধে ৬৬-৬৯ হাজার আফগান সেনা ও পুলিশ মারা গেছেন। পাকিস্তানের সেনা মারা গেছে ৯ হাজার ৩১৪ জন। গবেষণা বলছে, এ সময়ের মধ্যে ১৩৬ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী এবং ৫৪৯ জন মানবাধিকারকর্মী মারা গেছেন। গবেষণায় সরাসরি যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন রোগবালাই, খাবার কিংবা পানির সংকটেও আরো অনেক   মানুষ মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধ চলাকালীন এই ২০ বছরে যুত্তরাষ্ট্রকে গুনতে হয়েছে ২ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।