আলাউদ্দিন চৌধুরী
Åদরিদ্রদের আয় বাড়লেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি
Åমাত্র সাড়ে ১৮ শতাংশ প্রশিক্ষণ পেয়েছেন
দেশের গ্রাম পর্যায়ে মানুষদের সংগঠিত করে দারিদ্র্য বিমোচন ও আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পটি। কিন্তু এ প্রকল্পের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সুবিধা পেয়েছে তুলনামূলক দরিদ্র নয়, সচ্ছল এমন ব্যক্তিরা। প্রকল্পটির মাধ্যমে সারা দেশে গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্রদের নিয়ে সমিতি গঠন করা হয়েছে। ৬০ সদস্যবিশিষ্ট সমিতিতে গড়ে ৯ থেকে ১০ জন সদস্য রয়েছেন যারা নীতিমালা অনুযায়ী কিছুতেই সমিতির সদস্য হওয়ার কথা নয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক জরিপে বলা হয়েছে, সারা দেশে গ্রাম সমিতির ৫৬ লাখ ৭৭ হাজার সদস্যদের মধ্যে ৯ থেকে ১০ লাখ সদস্য আছেন যারা সমিতির সদস্য হওয়ার মতো উপযুক্ত নয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মরত প্রকল্পের মাঠ সহকারী অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কয়েক জনের সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচন করেছেন। ফলে নীতিমালা বহির্ভূত অনেক সচ্ছল ব্যক্তি সমিতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০টি বিশেষ উদ্যোগের মধ্যে একটি যা শুধু দরিদ্র মানুষের জন্য নিবেদিত। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ (৪র্থ সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পটি দেশের ৬৪টি জেলার ৪৯২টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে। শুরুতে একটি বাড়ি একটি খামার নাম থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেটি পরিবর্তন করে আমার বাড়ি আমার খামার রাখা হয়। গঠন করা হয় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক। পল্লি এলাকায় বসবাসকারী দরিদ্র মানুষদের সংগঠিত করে ক্ষুদ্র সঞ্চয় মডেলে তাদের মধ্যে সঞ্চয় প্রবণতা তৈরি ও স্থায়ী ঘূর্ণায়মান তহবিল গঠনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে মোট ১ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ পর্যন্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। প্রকল্পটি সর্বমোট চার বার সংশোধন করা হয়। সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৮৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সেই সঙ্গে এর মেয়াদ চলতি বছরের জুন মাসে শেষ হয়। ইতিমধ্যে প্রকল্পটির ১২ বছর অতিবাহিত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে দরিদ্র মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়েছে সেটি জানতে আইএমইডি একটি বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা করেছে। মোট ১ হাজার ২০০ উপকারভোগীর সাক্ষাত্কার এবং বিভিন্ন স্থানে দলগত তথ্য সংগ্রহ করে এই জরিপের মাধ্যমে প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উপকারভোগীদের আয়-উপার্জন এবং খাদ্যনিরাপত্তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। উপকারভোগীদের মাসিক আয় যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে গত প্রায় দেড় বছর ধরে কোভিড-১৯-এর কারণে সারা দেশে মানুষের কর্মসংস্থান এবং আয়-রোজগার দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। শহরের মতো গ্রাম এলাকায়ও অয়-রোজগার কমেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে যেসব মানুষের আয় বেড়েছে করোনার প্রভাবে তার ২৫ থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত প্রকৃত আয় কমে গেছে।
তবে প্রকল্পভুক্ত হওয়ার পূর্বের অবস্থার তুলনায় উপকারভোগী নারী-পুরুষ সদস্য পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। নারী উপকারভোগীদের মধ্যে ৫০ ভাগ পরিবারে পূর্বে সারা বছর খাদ্যনিরাপত্তা ছিল। বর্তমানে প্রায় ৮৫ ভাগ নারী উপকারভোগী পরিবারে কোনো খাদ্য ঘাটতি নেই। একইভাবে ৯১ ভাগ পুরুষ উপকারভোগী পরিবারে খাদ্য ঘাটতি নেই। প্রকল্পটি নারীর ক্ষমতায়নে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পেরেছে বলে জরিপে উঠে এসেছে।
জরিপে উপকারভোগীদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, ঋণের টাকা যে উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল সেই কাজে ব্যয় করা হয়েছে কি না। বেশির ভাগ উত্তরদাতা আয়বর্ধক কাজেই ঋণের টাকা ব্যয় করেছেন। তবে প্রতি আট জনের মধ্যে একজন ঋণ গ্রহণকারী জানিয়েছেন তারা পরিবারের অন্য জরুরি প্রয়োজনে টাকা ব্যয় করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির আওতায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন ঋণ কর্মসূচির আওতায় ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। তাই এত অল্প টাকার ঋণ নিয়ে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দাঁড়ানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়নি।
পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, প্রকল্প এলাকায় সব দরিদ্র পরিবারকে প্রকল্পভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এর মূল কারণ হলো সমিতি গঠনের সময় নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সদস্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দুই ধরনের ত্রুটির চিত্র উঠে এসেছে। একটি হলো যোগ্যতা নেই এমন লোককে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা এবং দ্বিতীয়টি হলো যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাছাই প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কারণে উপযুক্ত ব্যক্তিকে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত না করা। গড়ে প্রতি সমিতিতে ১০/১১ জনের মতো সদস্য আছেন যারা নীতিমালা অনুযায়ী সমিতির সদস্য হওয়ার কথা নয়। তাদের কারণে অনেক যোগ্য পরিবার সদস্য হওয়া থেকে বাদ পড়েছে। এছাড়াও গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মধ্যে যারা একেবারেই হতদরিদ্র তাদের অনেকের মাসে ২০০ টাকা সঞ্চয়ের সামর্থ্য নেই। তাছাড়া প্রকল্পে সুবিধাদি সম্পর্কেও তারা ততটা অবহিত নন।
অপ্রতুল প্রশিক্ষণ :প্রকল্পের আওতায় সদস্যদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম একেবারেই অপ্রতুল বা অকার্যকর বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রকল্পের শুরু থেকে ২০১৬ পর্যন্ত প্রতি সমিতি থেকে পাঁচ জন সদস্যকে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা ছিল। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যগণ পরবর্তী সময়ে সমিতির অন্য সদস্যদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদানের কথা। কিন্তু বাস্তবে এই কার্যক্রমের খুব একটা কার্যকর হয়নি। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছে তাদের অন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো দক্ষতা অর্জিত হয়নি। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র সাড়ে ১৮ শতাংশ প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। বাকিরা কোনো প্রশিক্ষণ পানানি। জরিপকালে অনেক উপকারভোগী বলেছেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে তারা ঋণ নিয়ে হাঁস-মুরগি পালন, গবাদিপশু পালন, মত্স্যচাষ, নার্সারি ইত্যাদি বিভিন্ন ট্রেডে থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী আয়-রোজগার করতে পারছেন না। তবে জরিপকালে দলগত আলোচনায় ৮০ ভাগ জনিয়েছেন যে, তারা প্রকল্পের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট। ২০ ভাগ জানিয়েছেন তারা মনে করেন প্রশিক্ষণ না পাওয়ার কারণে ঋণের টাকা যথাযথ ব্যবহার করতে পারেননি। ফলে তাদের আয়-রোজগার পূর্বের তুলনায় খুব একটা বৃদ্ধি পায়নি।
প্রকল্পটির কার্যক্রম টেকসই করার জন্য পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। যার ৫১ ভাগ শেয়ারের মালিক সরকার এবং বাকি ৪৯ শতাংশ শেয়ারে মালিকানা রয়েছে আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের আওতায় গঠিত সমিতিসমূহ। দেশের ৪৮৫টি উপজেলায় ব্যাংকের শাখা স্থাপন হয়েছে। ইতিমধ্যে ৬৮ হাজার ৬৭টি সমিতির নামে হিসাব খোলা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে সব সমিতি পর্যায়ক্রমে এই ব্যাংকের অধীনে চলে আসবে।