আমতলী চাওড়া খালে পচা পানি ভোগান্তিতে ৮০ হাজার মানুষ

চার বছরেও অগ্রগতি নেই ৭৫৬ কোটি টাকার প্রকল্পের

শাহাবুদ্দিন পান্না, আমতলী (বরগুনা) সংবাদদাতা

‘খালের পানি পইচ্যা গ্যাছে, গন্ধে মোরা বাড়ি থাকতে পারি না, ঘুমাইতে পারি না, চলতে পারি না, খালি গন্ধ আর গন্ধ। হেইআর মধ্যে আবার মশা, মাছি আর সাপের উত্পাত। এই ভিডা ছাইর্যা যাইতেও পারি না আবার গন্ধ সইতেও পারি না। মোগো অইছে মরণ দশা।’ কথাগুলো বলছিলেন আমতলীর তুজির ঘোজার ষাটোর্ধ বিধবা আলেয়া বেগম। তার মতো কষ্টে আছেন চাওড়া খালের পাড়ের ২৬টি গ্রামের ৮০ হাজার মানুষ। পঁচা পানির দুর্গন্ধ আর মশা-মাছি-সাপের সঙ্গে বেঁচে আছেন তারা। পরিবেশ প্রতিবেশের কারণে তাদের জীবন আজ বিপন্ন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমতলীর চাওড়া খালটি তিনটি ইউনিয়ন এবং আমতলী পৌরসভার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রমত্ত পায়রা নদীতে মিশেছে। এই খালের অন্তত ২০টি শাখা খালের মাধ্যমে ২৬টি গ্রামের প্রায় ৮০ হাজার মানুষের পানি প্রবাহ এবং জীবন-জীবিকা জড়িত। ১৯৮৩ সালে আমতলীর চাওড়া খালে পানি উন্নয়ন বোর্ড অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করে। বাঁধ নির্মাণের সময় বিপরীত দিকের সুবন্ধি নামক স্থান দিয়ে পানি নিষ্কাশনের জন্য খোলা রাখা হয়। এই অংশের মাধ্যমে চাওড়া খালের পানি গাবুয়া এবং আগুনমুখা নদীতে ওঠানামা করত। নদীর এই খোলা অংশটিও ২০০৯ সালে আমতলী উপজেলা পরিষদের সাবেক (বরখাস্ত হওয়া) চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন তালুকদার প্রভাব খাটিয়ে বাঁধ নির্মাণ করে আটকে দেন। আমতলী এবং সুবন্ধি অংশে বাঁধ দেওয়ায় ভিতরের পানি প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় একদিকে শুষ্ক মৌসুমে শাখা প্রশাখাগুলো পানির অভাবে সম্পূর্ণ মরে যেতে থাকে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমেব জলাবদ্ধতায় ফসল হারায় প্রায় ১৫টি গ্রামের মানুষ। মূল চাওড়া খাল কচুরিপানায় ভরে মানুষের সেচ কাজসহ নৌ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় মশা-মাছি এবং সাপের উপদ্রব। কচুরিপানায় খাল ভরে যাওয়ায় শুকনো মৌসুমে এই খালের পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মানুষ তো দূরের কথা, পশুপাখিও এই পানি ব্যবহার করে না। শুকনো মৌসুমে খালের পানি পচে যাওয়ায় সেচ কাজেও লাগানো যাচ্ছে না। এই খালের পচা পানি ব্যবহারের ফলে অনেকের শরীরে দগদগে ঘা হয়ে গেছে। উত্তর তক্তাবুনিয়া গ্রামের রামেশ্বর চন্দ্র বলেন, ‘এই হুগনা মৌসুমে পানি পইচ্যা গন্ধ আয়। পচা পানির গন্ধে মোরা দিনে রাইতে বাড়িতে থাকতে পারি না।’

খালে কচুরিপানার কারণে আরো প্রায় ১৫-২০টি শাখা নদীও মরে কচুরিপানা জমে ভরাট হয়ে গেছে। ‘মরে যাওয়া খালগুলো হচ্ছে, বলই বুনিয়া, হলদিয়ার কাউনিয়া, রামজির খাল, ঘুঘুমারি খাল, আড়ুয়াবৈড়াগি খাল, নাচনাপাড়া খাল, চিলা খাল, ছুরিকাটা খাল, লোদা খাল, চলাভাঙ্গা খাল, পাতাকাটা খাল, লক্ষ্মীর খাল এবং কালীগঞ্জের খাল। চাওড়া খালের এই বাঁধের কারণে আমতলী পৌরসভার ৩ নম্বর এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডসহ আমতলী সদর ইউনিয়নের ছুরিকাটা, মহিষডাঙ্গা, নাচনা পাড়া, পূর্ব আমতলী, আড়ুয়া বৈরাগী, চলাভাঙ্গা, হলদিয়া ইউনিয়নের হলদিয়া, উত্তর তক্তাবুনিয়া, গুরুদল, লক্ষ্মী, রাওঘা, কাঠালিয়া, এমপির হাট, রামজি, চিলা, ঘুঘুমারি, সোনাউটা, দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া এবং চাওরা ইউনিয়নের চলাভাঙ্গা, কাউনিয়া, চন্দ্রা, পাতাকাটা, তালুকদার হাট, লোদাসহ ২৬টি গ্রামের ৮০ হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাওড়া খাল সমস্যা সমাধানে ২০১৭ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৭৫৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরে একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখনন, কচুরিপানা পরিষ্কার, পাঁচ ব্যান্ডের স্লুইস নির্মাণ করে খালের পানি প্রবাহের গতি ফিরিয়ে আনা। কিন্তু চার বছর অতিবাহিত হলেও সে প্রকল্প আর আলোর মুখ দেখেনি।

স্থানীয় পরিবেশ কর্মীরা মনে করেন, চাওড়া খালের সমস্যা সমাধানের জন্য সুবন্ধি বাঁধ কেটে পানি প্রবাহ সচল করলে চাওরা খাল আবার তার প্রাণ ফিরে পাবে। বেলা (বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি) বরিশালের সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন বলেন, চাওড়া খালের সমস্যার কারণে ঐ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ নিত্যদিনকার ব্যবহারযোগ্য পানি সমস্যায় ভুগছে। এই খালের পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে এখনই সঠিক প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি।

বরগুনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার আলম জানান, চাওড়া খালের কচুরিপানা অপসারণ করে খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য ৭৫৬ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরগুনার জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান জানান, চাওড়া খালের পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য যা করা প্রয়োজন এজন্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।