জানা-অজানা

বিশ্বের প্রাচীনতম গুপ্ত সংগঠন ফ্রিম্যাসনারি

ইতিহাস পর্যালোচনা করে বিশ্বের সবচাইতে প্রাচীন যে গুপ্ত সংগঠনের কথা জানা যায় তার নাম ফ্রিম্যাসনারি। বলা হয়ে থাকে, খ্রিস্টের জন্মেরও হাজার বছর পূর্বে জেরুজালেমের সলোমন মন্দিরের যে নির্মাতারা ছিলেন, তাদের মধ্য থেকেই এই গুপ্তগোষ্ঠির উদ্ভব হয়েছিল। ফ্রিম্যাসনরি মূলত রাজমিস্ত্রিদের একটি ভ্রাতৃসংগঠন। তারা বিভিন্ন গোপন চিহ্ন এবং প্রতীক ব্যবহার করে একে অপরকে চিনতে পারে এবং বিভিন্ন রীতিনীতি পালন করে। এই গুপ্ত সংগঠনটির সঙ্গে বিভিন্ন সময় বিশ্বের কিছু বিখ্যাত-কুখ্যাত সংগঠনের যোগাযোগ ঘটেছিল। ধারনা করা হয় মধ্যযুগে ত্রাস সৃষ্টিকারী নাইট টেম্পলারদের সঙ্গেও ফ্রিম্যাসনারিদের যোগাযোগ ছিল। ফ্রিম্যাসনারিদেরকে সেই অর্থে গুপ্ত সংগঠন বলা যায় না কারণ তাদের অস্তিত্ব পুরোপুরি গোপন নয়। বিভিন্ন দেশে প্রকাশ্যেই তাদের বিচরণ রয়েছে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য এবং কার্যক্রম কিছু কিছু ক্ষেত্রে গোপন এবং সন্দেহজনক। একারণেই বিশ্বের অনেক দেশে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশ্বের অনেক বড় বড় ঘটনা-দুর্ঘটনার পিছনে দায়ী করা হয় ফ্রিম্যাসনারিদেরকে। তবে ফ্রিম্যাসনারিদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকলেও ইউরোপের এনলাইটেনমেন্টের পেছনের প্রকৃত কারিগর বিবেচনা করা হয় তাদেরকেই। সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতকের উত্তাল সময়ে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং আমেরিকার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সমাজিক উত্থানের পেছনে শক্তিশালী ভুমিকা পালন করে ফ্রিম্যাসনারিরা। এই গুপ্ত সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ফরাসি লেখক ভলটেয়ার, জার্মান সংগিতবিদ মোজার্ট, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন প্রমুখ ব্যক্তিত্ব। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সময় সংগঠনটি তাদের নাম পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। কখনো ম্যাসনিক গিল্ড নামে পরিচিত হয় তারা, আবার কখনো একেবারেই গায়েব হয়ে যায় তাদের সকল কাজকর্ম।

ফ্রিম্যাসনারিদের ইতিহাস, উদ্ভব-উত্পত্তি এং তাদের গোপন কর্মকান্ডের বিষয়ে সর্বপ্রথম লিখিত বক্তব্য প্রদান করেন ক্রিস্টোফার নাইট ও রবার্ট লোমাস তাদের লেখা হিরাম কী নামক বইতে। প্রাচীন বিভিন্ন নথি যেমন ডেড সী অব স্ক্রল ঘেটে তারা জানানোর চেষ্টা করেন, ফ্রিম্যাসনারিদের উদ্ভব ইউরোপে মনে করা হলেও আসলে গোষ্ঠিটি গঠিত হয়েছিল জেরুজালেমের সলোমন মন্দিরে। রাজা সলোমন যাদুবিদ্যা ও আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞার জন্য প্রখ্যাত ছিলেন। তিনি টেম্পল অব সলোমনের স্থাপত্য নকশাটি স্বয়ং ইয়াওয়ের (হিব্রুভাষায় ঈশ্বর) কাছ থেকে পান এবং সে কারণেই স্বর্গীয় নকশাটি হয়ে উঠেছিল এক অতীন্দ্রিয় জ্ঞানের উত্স। হাইরাম আবিফ ছিলেন টেম্পল অব সলোমন- এর প্রধান স্থপতি। তত্কালীন সময়ে হাজার খানেক কারিগরের মধ্য থেকে হাইরাম আবিফকে বেছে নেয়া হয় কারণ কারিগরদের মধ্যে একমাত্র তিনিই স্বর্ণ, রৌপ্য এবং ব্রোঞ্জ নিয়ে কাজ করতে পারতেন। হাইরাম আবিফই অন্য নকশাকারদের ঈশ্বর থেকে প্রাপ্ত নকশাটি বুঝিয়ে দিতেন। মন্দিরের কাজ চলাকালীন পাথর কাটা মিস্ত্রিদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল ম্যাসনিক গিল্ড যা পরবর্তীতে ফ্রিম্যাসনারিতে রূপ লাভ করে। মধ্যযুগে ইউরোপে ক্যাথিড্রাল নির্মাণের যুগে ম্যাসনরা ছিল স্বাধীন, তারা ইউরোপের যে কোনো অঞ্চলে সীমান্ত অতিক্রম করে চলে যেতে পারত। এই কারণে তাদের বলা হত ফ্রিম্যাসন। ১৭১৭ সালে আধুনিক ফ্রিম্যাসন গোষ্ঠীর যাত্রা শুরু হয় এবং সে বছরের ২৪ জুন লন্ডনে প্রথম ফ্রিম্যাসনদের গ্রান্ড লজ প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্যযুগে সমগ্র ইউরোপ ছিল খ্রিস্টীয় গির্জার কঠোর নিয়ন্ত্রনে। দীর্ঘকাল ধরেই রোমান ক্যাথলিক চার্চ ফ্রিম্যাসনদের কঠোর সমালোচনা করে আসছিল। ফ্রিম্যাসনদের গোষ্ঠীতে যোগদানের ওপর ১৭৩৮ খ্রিস্টাব্দে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়; বলা হয়-কোনও ক্যাথলিক ওই অশুভ সংঘে যোগ দিলে তাকে বহিস্কার করা হবে। ফ্রিম্যাসনদের ওপর গির্জার এই আক্রোশ পরবর্তীকালেও অব্যাহত থাকে।

হাইরাম আবিফ কিংবা টেম্পল অব সলোমনের অস্তিত্ব সম্পর্কে আধুনিক ঐতিহাসিকগণ নিশ্চিত না হলেও টেম্পল অব সলোমনের আদলে পরবর্তীকালে ইউরোপ এবং আমেরিকায় কয়েক হাজার মেসোনিক লজ বা মিস্ত্রিদের কুঠির গড়ে তোলা হয়েছে। এইসব লজের গোপন চেম্বারে ফ্রিম্যাসনরা সমবেত হয়ে আজও গোপন কৃত্যে অংশ নেয় এবং তাদের মধ্যকার জ্ঞানের বিনিময় হয়। আধুনিক ফ্রিম্যাসনারিতে তিনটি ডিগ্রি রয়েছে। (১) Entered Apprentice (২) Fellow Craft (৩) Master Mason-সর্বশেষ এই ডিগ্রি অর্জন করতে না পারলে গোপন কৃত্যে অংশ নেওয়া যায় না। ফ্রিম্যাসনরা দাবি করেন তারা মুক্ত এবং স্বাধীন চিন্তার অধিকারী, পাশাপাশি তারা অজ্ঞতা, গোঁড়ামি এবং স্বৈরাচারকে ধ্বংস করতে চায়। ফ্রিম্যাসনারিদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয় ম্যাসন বা রাজমিস্ত্রিদের প্রতীক কম্পাস। কম্পাস এবং বর্গক্ষেত্রের মাঝে থাকে G, এটি গড এবং জিওম্যাট্রি এই দুটি শব্দের প্রতীক। ফ্রিম্যাসনারিদের কাছে গড বা সৃষ্টিকর্তা হলেন একজন বিশাল মাপের আর্কিটেক্ট, আর জ্যামিতির জ্ঞান ছাড়া যেহেতু স্থাপত্যকলা সম্ভব নয়, তাই জ্যামিতিকেই ম্যাসনারিদের মূল উপজীব্য এবং পালনীয় রীতি ধরা হয়।

ইতিহাসে ফ্রিম্যাসনারিদেরকে নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা কিংবা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচলিত থাকলেও, সরাসরি তাদের অস্তিত্বের বিরোধিতা করা সম্ভব নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা নানা রকম প্রথা এবং গোপন আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছে এবং নানান রকম আকার-ইঙ্গিত এবং বিতর্কিত গোপন তথ্য তাদেরকে করে তুলেছে আরও রহস্যময়।