দেশে গতকাল কোভিডে মৃত্যু ও আক্রান্তের জোড়া রেকর্ড হইয়াছে। কঠোর বিধিনিষেধও আরো এক সপ্তাহ বাড়ানো হইয়াছে। গতকাল করোনা ভাইরাসে মৃত্যু হইয়াছে ১৬৪ জনের। ভাইরাস শনাক্ত হইয়াছে ৯ হাজার ৯৯৪ জনের শরীরে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ছিল ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাত্ গড়ে তিন জনের মধ্যে এক জনের শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া গিয়াছে। ইহা অত্যন্ত বিপজ্জনক আলামত। কারণ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো দেশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রহিয়াছে কি না, তাহা বুঝিবার একটি নির্দেশক হইল পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার। কোনো দেশে টানা দুই সপ্তাহের অধিক সময় পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্ত ৫ শতাংশের উপরে থাকিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে রহিয়াছে বলিয়া ধরা যায়। সেইখানে কয়েক দিন ধরিয়া বাংলাদেশে রোগী শনাক্ত ২০ হইতে ২৯ শতাংশের কাছাকাছি হইতেছে। অর্থাত্ প্রায় চার-পাঁচ গুণ বেশি মাত্রায় রোগী শনাক্ত হইতেছে।
এইদিকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত রোগীদের ৫০ শতাংশের অধিক গ্রামের মানুষ। এই সকল রোগী রোগের তীব্রতা অনেক অধিক হইবার পর হাসপাতালে আসিতেছেন। অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর অভিযোগ প্রতিদিনই বাড়িতেছে। অক্সিজেনের সংকটে কী ভয়াবহ অবস্থা হইতে পারে, তাহার খুব ভয়ংকর উদাহরণ কিছু দিন পূর্বে ভারতে দেখা গিয়াছিল। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী কিছু দিন আগে জানাইয়াছিলেন, দেশে বর্তমানে সাধারণ ও কোভিড রোগী মিলাইয়া ৭০-৮০ টন অক্সিজেন প্রয়োজন। এই মুহূর্তে দেশে অক্সিজেন উত্পাদন সক্ষমতা রহিয়াছে ২২০-২৩০ টন। গত এপ্রিলে করোনার সর্বোচ্চ অক্সিজেন চাহিদা ছিল ২১০ টন। বলা হইতেছে যে, দেশে এই মুহূর্তে অক্সিজেনের সংকট নাই। সরকারিভাবেও প্রায় ৯০০ টন মজুত রহিয়াছে। তবে অক্সিজেন সরবরাহের সহিত জড়িত ব্যক্তিরা বলিতেছেন, অক্সিজেনের মজুত থাকিলেও তাহা সরবরাহে দক্ষ ব্যবস্থাপনা জরুরি। বর্তমানে অক্সিজেন পরিবহনের জন্য ট্যাংকারের অভাবও রহিয়াছে। অধিকাংশ হাসপাতালে সেন্ট্রাল পাইপলাইনে স্বাভাবিক সক্ষমতার চাইতে এখন বাড়তি অক্সিজেন সরবরাহ করা হইতেছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হইলে ইহাতে নূতন বিপদ দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন রোগীর মিনিটে ১৫ লিটারের মতো অক্সিজেন দরকার পড়িলে তাহা সিলিন্ডার হইতে সরবরাহ করা যায়। আর মিনিটে ৩০ লিটারের মতো অক্সিজেন লাগিলে হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ব্যবহার করিতে হয়। আর ইহার জন্য দরকার হয় সেন্ট্রাল অক্সিজেন পাইপলাইন। আইসিইউ চালাইতেও দরকার সেন্ট্রাল অক্সিজেন পাইপলাইন। গত বত্সর করোনা সংক্রমণ বাড়িতে থাকিলে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসানোর উদ্যোগ লইয়াছিল সরকার; কিন্তু এখনো দেশের ১৭টি জেলায় সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট নাই। এই অবস্থায় রোগীর সংখ্যা অনেক অধিক বৃদ্ধি পাইলে তাহা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করিতে পারে সন্দেহাতীতভাবে।
অতি সম্প্রতি ভারতে করোনার ভয়াবহ অভিঘাতের যেই চিত্র আমরা দেখিয়াছি, তাহা হইতে আমাদের শিক্ষা লইতে হইবে। কারণ, ভারতে ডেলটা ভ্যারিয়েন্টই এখন আমাদের নাকানিচুবানি খাওয়াইতেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানাইয়াছে, ডেলটা ধরন এখন অবধি করোনা ভাইরাসের সবচাইতে অধিক সংক্রামক প্রজাতি। যেই সকল দেশে টিকাকরণের হার কম, সেইখানে দ্রুত ছড়াইতেছে এই প্রজাতির করোনা ভাইরাস। বিশ্বের ৯৬ দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছে ডেলটা ধরন। এইদিকে বাংলাদেশে এখন বর্ষার মৌসুম বিধায় অনেকেই করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হইলেও সাধারণ সর্দি-জ্বর বা কাশিতে আক্রান্ত বলিয়া ধরিয়া লইতেছেন। তাহারা পরীক্ষা করাইতেছেন না এবং চিকিত্সকেরও পরামর্শ লইতেছেন না। সুতরাং শারীরিক দূরত্ব কঠোরভাবে বজায় রাখাসহ মাস্ক পরা, স্যানিটাইজার ব্যবহার করিবার মতো বিষয়গুলি কঠোরভাবে মানিয়া চলিতেই হইবে। ইহার পাশাপাশি আমাদের ৭০ শতাংশ নাগরিককে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিকার আওতায় আনিতে হইবে। ইহা ব্যতীত আর কোনো পথ খোলা নাই।