ঘরে ঘরে জ্বর-সর্দি পরীক্ষায় অনীহা

শহরে ও গ্রামে আশঙ্কাজনক হারে জ্বর-সর্দি ও কাশির প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বর-সর্দি ও শ্বাসসকষ্ট (করোনা উপসর্গ) নিয়ে প্রতিদিন মৃত্যুও হচ্ছে। বিড়ম্বনায় পড়ার ভয়ে অনেকেই পরীক্ষা করাচ্ছেন না। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে হাসপাতালগুলোতে। সীমান্ত এলাকায় বেড়েছে সংক্রমণ। খবর প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের :

গাইবান্ধা :জেলা জুড়ে জ্বর, সর্দি ও কাশির প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন এলাকার প্রায় সব বয়সের লোকজন এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সর্দি-জ্বর ও শ্বাসকষ্ট (করোনা উপসর্গ) নিয়ে প্রতিদিন একাধিক ব্যক্তির মৃত্যুও হচ্ছে। সোমবারও দুই জন মারা গেছেন। তারপরও এসব রোগে আক্রান্ত রোগী হোম কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন এবং বাড়ি লকডাউন পরিস্থিতি এড়াতে পরীক্ষা করাচ্ছেন না। আবার অনেকেই জানেন না কোথায় কীভাবে এই করোনার পরীক্ষা করাতে হয়। এদিকে যারা পরীক্ষা করাচ্ছেন, তাদের মধ্যে বেশির ভাগ ব্যক্তির করোনা পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছে। এদিকে জেলা সদর ও উপজেলা সদর বাজারের সবকটি ওষুধের দোকানেই ভিড় চোখে পড়েছে। কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগই এসেছেন জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টের ওষুধ নিতে। সাদুল্লাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহীনুল ইসলাম মণ্ডল জানান, গতকাল সোমবার বহির্বিভাগে চিকিত্সাসেবা নেন ১৩২ জন। এর মধ্যে ১২ জনের পরীক্ষা করা হয়। পাঁচ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। গাইবান্ধা সদর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, সাধারণত সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত রোগীরা গুরুতর অসুস্থ না হলে হাসপাতালে আসেন না। নিজের ইচ্ছে মতো প্যারাসিটামল বা অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খান। এটা মোটেও ঠিক না। কারণ এখন করোনা ভাইরাসও রয়েছে। গাইবান্ধার সিভিল সার্জন আ ক ম আখতারুজ্জামান বলেন, রেপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট কিটের মাধ্যমে দ্রুত পরীক্ষার জন্য প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। কিন্তু লোকজন উত্সাহিত হচ্ছে না। উত্সাহ দিতে স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠ কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

ভোলা (দক্ষিণ) :ভোলায় হঠাত্ করে বেড়েছে শিশুদের  নিউমোনিয়ায় ও ঠাণ্ডাজনিত রোগ। প্রতিদিনই ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল  হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে ৫০-৬০ জন শিশু। ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রতিদিন অধিক রোগী ভর্তি হওয়ায় এক বেডে দুই শিশু চিকিত্সা নিচ্ছে। আবার কোনো কোনো বেডে তিন জনও  চিকিত্সা নিচ্ছে। গত ১ জুলাই থেকে ৫ জুলাই দুপুর পর্যন্ত ভোলা সদর হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে ২৩৩ শিশু রোগী ভর্তি হয়ে চিকিত্সা নিয়েছে। ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল  হাসপাতালে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। বোরহানউদ্দিন পৌরসভার  ৯ নম্বর ওয়ার্ড এর বাসিন্দা শিশুর অভিভাবক মিঞ্জু বেগম জানান, আমার আড়াই মাস বয়সি ছেলের নিউমোনিয়া হয়েছে। আমি শনিবার বিকালে ভোলা সদর হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করেছি। সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের চিকিত্সক ডা. আব্দুল মাজেদ শাকিল জানান, আমার এখানে ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রতিদিন অধিক রোগী ভর্তি হওয়ায় বেডের সংকট রয়েছে। হাসপাতালের ডাক্তার সংকটের পাশাপাশি নার্স, স্টাফও সংকট রয়েছে। রোগীদের চিকিত্সা দেতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি, তারপর ও আমরা অনেক কষ্ট করে চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। সিভিল সারজন ডা. সিরাজউদ্দিন জানান, হাসপাতালে স্যালাইন ও ওষুধের কোনো সংকট নেই। তবে ডাক্তার, নার্স ও স্টাফ সংকট রয়েছে। আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।

সাতক্ষীরা : সীমান্তের গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি ঘরে এখন করোনা উপসর্গ বা করোনা আক্রান্ত রোগীর খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় একদিকে যেমন সংক্রমণের হার বাড়ছে, তেমনি মৃত্যুও বাড়ছে। সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবে ১২ জুন ২৪ ঘণ্টায় ৫২ জনের করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লাল্টু জানান ‘প্রায় বাড়িতেই জ্বর হচ্ছে। আমার ধারণা সাধারণ মানুষ লজ্জা, ভয় ও লকডাউনের বিড়ম্বনায় কেউ পড়তে চায় না। যে কারণে কেউ করোনা টেস্ট করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. হুসাইন সাফায়েত বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ বেশি অসচেতন। কেউ নমুনা পরীক্ষা করাতে চায় না। সেজন্য এখন গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে করোনা ছড়িয়ে গেছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ খুব কঠিন হবে আমাদের জন্য।’

কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) :কিশোরগঞ্জ উপজেলার গ্রামগঞ্জে, জ্বর, ডায়রিয়া, সর্দি-কাশির প্রকোপ বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন মানুষ স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তিসহ গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে চিকিত্সা নিচ্ছেন। ব্যাপক হারে করোনা ভাইরাসের সক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু সফি মাহমুদ জানান, কিশোরগঞ্জ উপজেলায় প্রতিদিন জ্বর-সর্দি, কাশিতে রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সোমবার এসব রোগে আউটডোর এবং ইনডোর মিলে মোট ২৫৫ জন রোগী চিকিত্সা নিয়েছেন। গত ১৫ দিনে জ্বর-সর্দি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৫ হাজারের মতো হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোকসানা বেগম বলেন, যারা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে দোকানপাট খোলা রাখছে তাদের জরিমানাসহ নিয়মিত মামলা দায়ের করা হচ্ছে। এদিকে, পিরোজপুর, জামালপুর, বান্দরবান, বাগেরহাট, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, হবিগঞ্জ, রাজশাহীর পুঠিয়া, পাবনার চাটমোহর, চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, বরিশালের আগৈলঝাড়া, সাতক্ষীরার তালায় করোনার সংক্রমণ বেড়েছে।