করোনায় অব্যাহত সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধির কারণে সরকার চলতি বিধিনিষেধ আগামী ১৪ জুলাই পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এই বিধিনিষিধের মেয়াদ আগামী ৭ জুলাই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় করোনার বিস্তার ঠেকাতে বিধিনিষেধের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কোভিড-সংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটি সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয়।
গতকাল সর্বোচ্চ রেকর্ড-সংখ্যক ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃত্যু হলো ১৫ হাজার ২২৯ জনের। বর্তমানে করোনায় সংক্রমণের হার গ্রামগঞ্জে বেশি। মোট আক্রান্তের ৫০ শতাংশই গ্রামে। কিন্তু গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় অক্সিজেন, সজ্জা ও আইসিইউর সংকট চরমে। ফলে অনেকেই ছুটছেন ঢাকায়। ঢাকায় এসেও জুটছে না সজ্জা, অক্সিজেন ও আইসিইউ। ফলে সবকিছু মিলিয়ে করোনায় বিপর্যস্ত নাগরিক জীবন। ইতিমধ্যে মানুষকে ঘরে থাকা বাধ্যতামূলক করতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে। জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তারা বিধিনিষেধ ভঙ্গ করার দায়ে জেল-জরিমানা পর্যন্ত করছেন। কিন্তু তাতেও মানুষকে পুরোপুরি ঘরবন্দি করা যাচ্ছে না। নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ, দিনমজুররা ইতিমধ্যে বেকার হয়ে পড়েছেন। সরকারিভাবে কিংবা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও পর্যাপ্ত ত্রাণসহায়তার ব্যবস্থা এখনো হয়নি। ফলে তারা কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ছেন রাস্তায়, বাজারে।
বিধিনিষেধের বর্ধিত সময়েও মানতে হবে যেসব নির্দেশনা—সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। সড়ক, রেল ও নৌপথে গণপরিবহন (অভ্যন্তরীণ বিমানসহ) ও সব ধরনের যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। শপিং মল বা মার্কেটসহ সব দোকানপাট বন্ধ থাকবে। সব পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদনকেন্দ্র বন্ধ থাকবে। জনসমাবেশ হয় এ ধরনের সামাজিক (বিবাহোত্তর অনুষ্ঠান-ওয়ালিমা, জন্মদিন, পিকনিক, পার্টি ইত্যাদি), রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আদালতসমূহের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে। ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে।
আইনশৃঙ্খলা ও জরুরি পরিষেবা যেমন—কৃষিপণ্য ও উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান, রাজস্ব আদায় সম্পর্কিত কার্যাবলি, বিদ্যুত্, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থা, ডাকসেবা, ব্যাংক, ফার্মেসি, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ অন্যান্য জরুরি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহের কর্মচারী ও যানবাহন প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে যাতায়াত করতে পারবে।
পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাক/লরি/কাভার্ড ভ্যান/কার্গো ভেসেল এই নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে। বন্দরসমূহ (বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থল) এবং সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ এই নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে। শিল্পকারখানাসমূহ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণপূর্বক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে। কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠন/বাজার কর্তৃপক্ষ/স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করবে। অতিজরুরি প্রয়োজন ছাড়া (ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়, চিকিত্সাসেবা, মৃতদেহ দাফন/সত্কার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। নির্দেশনা অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। টিকা কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে টিকা গ্রহণের জন্য যাতায়াত করা যাবে।
খাবারের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খাবার বিক্রয় (অনলাইন/টেকওয়ে) করতে পারবে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু থাকবে এবং বিদেশগামী যাত্রীরা তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের টিকিট প্রদর্শন করে গাড়ি ব্যবহারপূর্বক যাতায়াত করতে পারবে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে মসজিদে নামাজের বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দেবে।
‘আর্মি ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ বিধানের আওতায় মাঠ পর্যায়ে কার্যকর টহল নিশ্চিত করার জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ প্রয়োজনীয়সংখ্যক সেনা মোতায়েন করবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্থানীয় সেনা কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয় সভা করে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব ও আনসার নিয়োগ ও টহলের অধিক্ষেত্র, পদ্ধতি ও সময় নির্ধারণ করবেন। সেই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে বিশেষ কোনো কার্যক্রমের প্রয়োজন হলে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগসমূহ এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তার পক্ষে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করবেন।