করোনাকালেও আগের মতো তত্পর মাদক পাচারকারীরা

মাদক পাচারের ট্রানজিট পয়েন্ট চট্টগ্রামে করোনাকালেও আগের মতো তত্পর মাদক পাচারকারীরা। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, র্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বক্ষণিক তত্পরতা ও অভিযান সত্ত্বেও পাচারকারী ও তাদের ক্যারিয়ারদেরকে নানা কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যাচ্ছে। করোনাকালে দেশের নানা স্থানে মাদক পরিবহনের জন্য নৌপথের পাশাপাশি পণ্যবাহী যানবাহনে করেও মাদক চালান হচ্ছে বলে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো জানান। মাদকের এই বেপরোয়া বিস্তারের কারণে সামাজিকভাবে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে নিয়ে উদ্বেগ উত্কণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে অভিভাবক মহলে। স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় নতুন প্রজন্ম যাতে সর্বনাশা মাদকের খপ্পরে না পড়ে সেজন্য অভিভাবক ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সচেতন থাকার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন মনোবিদরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক বিপ্লব কুমার দে ইত্তেফাককে বলেন, বাড়ির মধ্যে মা-বাবা ও অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের আদর-স্নেহ দিয়ে আগলে রাখতে             হবে। কড়া শাসন, বকাঝকা ও অতিরিক্ত সমালোচনা পরিহার করে সন্তানদের গঠনমুখী কাজ ও আলাপ-আলোচনার মধ্যে রাখতে হবে। তারা যেন কোনো ধরনের মানসিক চাপের শিকার না হয়। এর মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মকে মাদকের থাবা ও হতাশা থেকে দূরে রাখা সম্ভব। ঘরের পরিবেশ রাখতে হবে শান্ত, স্নিগ্ধ ও মধুর।

এদিকে সর্বনাশা মাদক ইয়াবা চালানের পাশাপাশি চট্টগ্রামে ফেনসিডিলের নতুন সংস্করণ স্কাফ সিরাপের একটি চালান গত শনিবার চট্টগ্রামে প্রথম বারের মতো ধরা পড়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, ফেনসিডিলের মতো স্কাফ সিরাপও দেশের উত্তরাঞ্চল ও কুমিল্লার সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। গত ৩ জুলাই সীতাকুণ্ডের জোড় আমতল এলাকায় কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম আসা একটি ট্রাকে তল্লাশি করে র্যাব-৭ সদস্যরা স্কাফ সিরাপের একটি চালান এবং সেই সঙ্গে ট্রাক চালকসহ দুই জনকে আটক করে। এদিকে মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে আসা ইয়াবা চালানের উদ্বেগজনক চিত্রও পাওয়া গেছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পাঁচ মাসে চট্টগ্রাম মেট্রো দক্ষিণ উপ-অঞ্চলের উদ্যোগে ১ হাজার ১৭০টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে ইয়াবা আটক হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৮৪ পিস। গাঁজা উদ্ধার হয়েছে ১৬ হাজার ১০০ কেজি। চোলাই মদ ৬০ লিটার। মোট মামলা হয়েছে ২৩২টি। মাদক বহনকারী বা পাচারকারী আটক হয়েছে ২৩৪ জন। পাশাপাশি অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মেট্রো উত্তর উপ-অঞ্চলের উদ্যোগে পাঁচ মাসে ৭৩০টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে ৮৪ হাজার ৪১৫ পিস। গাঁজা উদ্ধার হয়েছে ১২ হাজার ৪৪৫ কেজি। মাদক বহনকারী আটক হয়েছে ১৯০ জন। পাশাপাশি গত জুন মাসে অধিদপ্তরের দক্ষিণ উপ-অঞ্চলের অভিযান পরিচালিত হয়েছে ২৩৪টি, মামলা হয়েছে ৩৯টি, মাদক পাচারকারী গ্রেফতার হয়েছে ৪২ জন। উত্তর অঞ্চলে ১৩১টি অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে ২৯ জন পাচারকারী, মামলা হয়েছে ২৯টি।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিচালক মো. এমদাদুল ইসলাম বলেন, করোনা সংক্রমণকালে লকডাউন চলাকালেও ইয়াবা পাচার কমেনি। ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। আমরা নানা স্থানে মাদক বহনকারীদের ধরতে চেকপোস্ট বসাচ্ছি। ক্যারিয়াররা ধরাও পড়ছে, কিন্তু মূল পাচারকারীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব ক্যারিয়ারদের অধিকাংশই ঢাকা, যশোর ও উত্তরাঞ্চলের। তারা অনেকটা জঙ্গিদের স্লিপার সেলের সদস্যদের মতো। তারা নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাদক নিয়ে আরেকটি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেয়। মাদকগুলো কে দিল এবং এগুলোর শেষ গন্তব্য কোথায় সে সম্পর্কে তাদের কিছুই জানানো হয় না।

মহানগরীর উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি, উত্তর) সালাম কবির বলেন, মহানগরী গোয়েন্দা পুলিশ মাদক পাচারকারীদের তত্পরতা রোধে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। ফলে প্রায়শ মাদকসহ পাচারকারীরা নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের জালে ধরা পড়ছে। র্যাব-৭-এর উপ-পরিচালক আনোয়ার হোসেন ভুঁইয়া বলেন, গত ৩ জুলাই সীতাকুণ্ডের জোড় আমতলে স্কাফ সিরাপ নামক মাদক পাচারের দায়ে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, মাদকাসক্তরা এই সিরাপ ফেনসিডিলের বিকল্প হিসাবে সেবন করে থাকে। র্যাব-৭ সব ধরনের মাদকের চালান প্রতিরোধে সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।