জমকালো আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক তাঁতি উত্সব-২০১৯

তাঁতে বোনা স্বপ্ন

খালেদ আহমেদ

 

ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াসে তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হলো ‘আন্তর্জাতিক তাঁতি উত্সব-২০১৯’। গত ১ ফেব্রুয়ারি বনানীর রাজউক মাঠে আয়োজিত দিনব্যাপী এই উত্সবে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী এএইচএম মুস্তাফা কামাল। উত্সবে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত ত্রান ভ্যান খৌ, ভুটানের রাষ্ট্রদূত সোনাম তবদেন রাবজি, ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত জাও তাবাজারা দে ওলিভিরা জুনিয়র, অবসরপ্রাপ্ত  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঞ্জুরুল কাদের ও ঢাকা গুলশান সোসাইটির সভাপতি শাখাওয়াত আবু খায়ের মোহাম্মদ। সময়ের পরিক্রমায় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে অভিজাত প্লাটফর্মে উপস্থাপনার মাধ্যমে আলোচনায় তুলে আনার চেষ্টায় এ উত্সব আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চীন, মায়ানমার, ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূতগন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যরা। 

বর্তমানে বিভিন্ন হস্তচালিত তাঁত, কুটির শিল্প প্রায় অবক্ষয়ের পথে। নারীশক্তি এগিয়ে এসেছে এই অবক্ষয় প্রতিহত করার জন্য। তাঁতিরা যেন তাদের কাজের প্রকৃত সম্মান পান, সেটাই এই আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য। অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত অতিথিদের  প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ হাতে মঞ্চে এসে স্বাগত জানান বাংলাদেশ হেরিটেজ অ্যান্ড ক্র্যাফট ফাউন্ডেশনের সদস্যগণ। এছাড়া আয়োজনে ছিলেন বিভিন্ন অঙ্গনের আইকনরা। এ আয়োজনটির পিছনে ফেস্টিভ্যাল চেয়ারপারসন টুটলী রহমানের ভাবনায় ছিল তরুণ প্রজন্ম। তারা যেন অনুধাবন করতে পারে একজন আইকন একদিনে হওয়া যায় না, অনেক পরিশ্রম, ত্যাগ দীর্ঘ সাধনা করেই তারা হয়েছেন আমাদের পথ প্রদর্শক। তারা একে একে মঞ্চে আসতে থাকেন—লাল সবুজ-পতাকা হাতে। দৃপ্ত পদে মঞ্চে প্রবেশ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা তিমির নন্দী,  ডালিয়া নওশীন ও লায়লা হাসান। এরপর উপদেষ্টা কেয়ার টেকার সরকার রোকেয়া রহমান, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট পারভীন মাহমুদ, জ্যামকন গ্রুপ-এর আমিনা আহমেদ, অবিন্তা গ্যালারির নীলু মুরশেদ, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক-এর ফেরদৌস মুরশেদ, স্কলাস্টিকার ওয়াসিমা পারভীন, চিত্রশিল্পী প্রফেসর রোকেয়া সুলতানা, চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুন্নি সাহা, সংগীত শিল্পী অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল এবং ফাতেমা তুজ জোহরা, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত চম্পা ও নিপুণ, ফ্যাশন ব্যক্তিত্ব সৈয়দ সিদ্দিকী রুমি ও আশরাফুন সিদ্দিকী, নৃত্য শিল্পী ডলি ইকবাল, নৃত্য শিল্পী কোরিওগ্রাফার ইভান শাহরিয়ার সোহাগ, মেক ওভার শিল্পী নিলুফার খন্দকার তাজ, কাজী কামরুল ইসলাম ও আফরোজা পারভীন, সবশেষে বাংলার বাঘেরা ক্রিকেট অঙ্গনের সুপারস্টার। যারা দেশকে নিয়ে গেছেন এক অন্য মাত্রায়, বাংলাদেশকে পৃথিবীর মানচিত্রে ঠাঁই করে দিয়েছেন। উপস্থিত ছিলেন আকরাম খান, হাবিবুল বাশার সুমন ও খালেদ মাসুদ পাইলট। এ সময় বেজে ওঠে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত সবাই গায়ে কাঁটা দেয়া অবিস্মরণীয় এক মুহূর্তে গলা মিলিয়ে গেয়ে ওঠেন ডালিয়া নওশীন, ফাতেমা তুজ জোহরা, তিমির নন্দী। উত্সবে পার্বত্য চটগ্রামের  ৪ জন  নৃ-শিল্পীবৃন্দকে এ অনুষ্ঠানে সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে আমাদের আদিবাসী সংস্কৃতি কতটা সমৃদ্ধ  তা তুলে ধরা হয়। সম্মাননাপ্রাপ্ত নৃ-শিল্পীরা হলেন বম জনগোষ্ঠীর পার কিম ময় বম, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর রাংগাপাতী ত্রিপুর, মারমা জনগোষ্ঠীর ডনাউ প্রু নেলী, তংচংগ্যা জনগোষ্ঠীর প্রমীলা তংচংগ্যা।  এ সময় বান্দরবন থেকে আগত নৃ-শিল্পী ডনাই প্রু পাহাড়ি বনফুলের শুভেচ্ছা জানিয়ে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমরাও বাংলাদেশি।’ নৃ-শিল্পীদের নিয়ে এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছেন বাংলাদেশ হেরিটেজ অ্যান্ড ক্র্যাফট ফাউন্ডেশন-এর উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঞ্জুরুল কাদের। এর পরেই শুরু বহুল প্রাত্যাশিত ফ্যাশন প্যারেড। আলোর নাচনে মঞ্চ মাতিয়ে দেশের খ্যাতনামা ডিজাইনররা একে একে প্রদর্শন করেন তাদের পোশাক পরিচ্ছদ। এবারে ডিজাইনার যারা ছিলেন—লিবাস-এর নাহিদ মঈন ও নাজমী মঈন, নন্দিত ডিজাইনার শাবানা আলী, আনোখীর হুমায়রা খান, বিশ্ব রঙ-এর বিপ্লব সাহা, মুনস বুটিক-এর নাসরিন জাহান, ক্যাটস আই-এর সাদিক সিদ্দিকী, চমনস-এর চমন চৌধুরী, জেএনজে-এর মাহজাবীন মুস্তাফিজ সিমিলি, জেডএস ফ্যাশন-এর জাহানারা রহমান ঝুনু। এবারও অনুষ্ঠানের চেয়ারপার্সন টুটলী রহমান তার অনবদ্য ক্রিয়েশন ফ্যাশন ফিউশন-এর চমক দিয়ে দর্শকের মনোরঞ্জন করতে ভোলেননি। আদিবাসী এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন  প্যারেডও নজর কেড়েছে সবার।

দেশের রুগ্ন বয়ন ও তাঁতশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা ও তাঁতি সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন এবং এর মধ্য দিয়ে এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার উদ্দেশ্য নিয়েই এই আয়োজন। বিগত দুই বছর সফলতার সাথে এই ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বরেণ্য ফ্যাশন ডিজাইনার ও ফেস্টিভ্যাল চেয়ারপারসন টুটলি রহমান বলেন, ‘৩য় বারের এই আয়োজনে কিছুটা ভিন্নতা আনা হয়েছে। এবারের উত্সবে ফ্যাশন ড্রামা, ফ্যাশন ফিউশন ছিল। বাংলাদেশের তাঁতশিল্পে বিশেষ অবদান রাখার জন্য আদিবাসী তাঁতিদের আজীবন সম্মাননা জানানো হয়েছে। সেই সাথে এবারই প্রথম বাংলাদেশ হেরিটেক ক্র্যাফট ফাউন্ডেশন এই উত্সবে অন্তর্ভুক্ত হলো।’ উত্সবে দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্টলে বিভিন্ন তাঁত সামগ্রী প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের জন্য উন্মুক্ত ছিল। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন প্রফেসর ইমরান রহমান এবং জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী পিন্টু  ঘোষ। উত্সবের বিশেষ আয়োজন ছিল কফি টেবিল বুক ‘এ ওয়েভার টেল’। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ হেরিটেজ অ্যান্ড ক্র্যাফট ফাউন্ডেশন-এর সেক্রেটারি আইরিন রব্বানী। এবারের উত্সবে মিডিয়া পার্টনার ছিল দৈনিক ইত্তেফাক আর ব্রডকাস্ট পার্টনার এটিএন বাংলা।

ছবি তন্ময়