লালমাটিয়ার তরুণরা আড়াই হাজার মানুষকে খাবার দিচ্ছেন প্রতিদিন

কয়েক জন তরুণ মিলে গত বছর লকডাউনের প্রথম দিকে যে কাজ শুরু করেছিলেন তারা, সে কাজ এবারও করছেন। এবারের লকডাউনে আবারও প্রতিদিন নিরন্ন মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। লকডাউন না থাকলে সপ্তাহে এক দিন খাবার বিতরণ করেন। রোজারও সময় করেছেন প্রতিদিন। এবার দেশ জুড়ে যখন কঠোর লকডাউন শুরু হলো তখন আবারও দৈনিক খাবার বিতরণ শুরু করেছেন তারা।

কয়েক জন তরুণের এই কঠিন প্রতিজ্ঞা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। ভালোবাসায় বুক ভরে ওঠে। যখন ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া ছাড়া মানুষ অন্য কিছু ভাবে না, যখন এই করোনাকালে নিজের পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে উদ্বিগ্ন নিরীহ নাগরিকরা—তখন নিজেদের কথা না ভেবে বরং দরিদ্র মানুষের সেবা করছেন তারা। এই উদ্যোগ আমাদের গর্বিত করে তোলে। গেল রোজার সময়ে তরুণদের এই উদ্যোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে ইত্তেফাক।

রীতিমতো দক্ষ যজ্ঞ। অথচ কী সাবলীলভাবেই না তারা করছেন এই কাজ। আয়োজকরা জানালেন, সকাল থেকে খাবারের জোগাড় শুরু হয়। বাজার করা, কাটাকুটি এরপর রান্না। বিশাল বিশাল চার পাতিল খিচুড়ি রান্না করা হয়। এরপর দুপুর থেকে বিতরণ শুরু হয়। এরপর যতক্ষণ খাবার নিতে মানুষ আসে ততক্ষণ চলতে থাকে। প্রয়োজনে আবারও রান্না বসানো হয়। লালমাটিয়ার ডি-ব্লকের ৩/৫ সড়কে যে কেউ নিতে পারেন এই খাবার। গত রবিবার গিয়ে দেখা গেল রিকশাচালক, ভাসমান-ছিন্নমূল মানুষরা আসছেন খাবার নিতে। কেউই খালি হাতে ফিরছেন না। থালায় থালায় বেড়ে দেওয়া হচ্ছে খিচুড়ি। যারা বাসায় নিতে চান তাদেরও ফেরানো হচ্ছে না।

গত বছর রোজার আগে শুকনো খাবার দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু করেছিলেন তারা। এরপর রোজায় প্রতিদিন খাবার দেওয়া শুরু করেন। এ বছরও রোজায় সেই কার্যক্রম চালু ছিল। তাদের এই উদ্যোগ দেশের মানুষের সামনে মানুষকে ভালোবাসার নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

এই দলের সদস্য আসমা আক্তার লিজা বলেন, অন্যসময় অনেক স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত হতেন। এবারের লকডাউনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতায় দূরের স্বেচ্ছাসেবকরা আসতে পারছেন না। ফলে অল্প স্বেচ্ছাসেবক নিয়েই আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

আয়োজকরা জানান, এমন একটা কাজ করা যায় এই ভাবনাটা প্রথম আসে লিজার মাথায়। তার সেই চিন্তাকে রূপ দিতেই আরো কয়েক জন তরুণ যুক্ত হয়। ১১ জনের একটি দল দাঁড়িয়ে যায়। পরে আরও অনেকে যুক্ত হন। এখন যারা কাজ করছেন তারা হলেন :ইরাজ মাহমুদী, মো. মনির হোসেন, আরাফাত শরীফ, আহমেদ আখতার জ্যোতি, মো. মামুন মিয়া, মো. মামুন সরকার, হূদয় হোসেন, মো. খালেকুর রহমান হাজারী, ইব্রাহীম খলিল ইফতি, জিহাদ মোল্লা প্রমুখ।

লিজা জানান এই উদ্যোগের শুরুর কথা। বলেন, ‘মার্চ ২৬, ২০২০। লকডাউনের সময় নিউ মার্কেট এলাকায় কুকুরদের খাবার খাওয়াতে গেছি। দেখি, কয়েকটা ছোট বাচ্চা একটা দোকান ভাঙার চেষ্টা করছে। আমাকে দেখে পালাচ্ছিল। ধরে বললাম, দোকান ভাঙছো কেন? উত্তরে বলল, এটা খাবারের দোকান। ভেতরে খাবার আছে। কোথাও তো খাবার পাচ্ছি না। তখনই বুঝলাম, করোনার সময় হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক দেওয়ার চাইতে বেশি জরুরি হচ্ছে খাবার দেওয়া। এই ঘরবন্দি অবস্থায় গরিব মানুষের কাছে খাবার পৌঁছানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’ লিজা জানান, আমার মতো কয়েকজন তরুণের নিরন্ন মানুষের মুখে খাবার পৌঁছে দেওয়ার সেই প্রতিজ্ঞা জন্ম দিল ‘মেহমান বাড়ি’র।

খাবার যারা নিতে আসেন তাদের বলা হয় মেহমান। প্রতিদিনই সেই মেহমানের সংখ্যা বাড়ছে। এ বছর রোজার সময় যেখানে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ মানুষকে খাওয়ানো হতো। এবারের লকডাউনে সে সংখ্যা ২ হাজার পেরিয়ে গেছে। কোনো কোনো দিন তা আড়াই থেকে ৩ হাজার হয়ে যায়। ফলে বেশি মানুষের খাবারের জন্য দরকার হয় বাড়তি টাকার। অবশ্য সেজন্য তাদের থেমে থাকতে হয়নি। শুভাকাঙ্ক্ষীরা পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখন তারা ভাবছেন লকডাউনের কারণে আয়হীন হয়ে পড়া অসহায় মানুষদের জন্য খাদ্যপণ্য সরবরাহের কথা।

আয়োজকরা জানান, ‘অনেক করপোরেট হাউজ আমাদের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসছে। কিন্তু আমরা সে টাকা গ্রহণ করতে চাইছি না। আমাদের লোকবল কম। আমরা সীমিত পরিসরে এই কাজটি করছি। এটা যদি কারো ভালো লাগে তারা সেটা নিজেদের এলাকায় করতে পারেন। আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করা জরুরি না। লালমাটিয়ার বাসিন্দারাসহ দেশের নানা প্রান্তের মানুষ টাকা দিয়ে এই কার্যক্রম চালাতে সহযোগিতা করছেন। আয়োজকরা বলছেন, এই সব কিছুই আমাদের অনুপ্রাণিত করে কাজটি করে যেতে। আমরা চাই, এই কাজটিকে মডেল ধরে দেশ জুড়ে সবাই এভাবেই নিরন্ন মানুষের পাশে এসে দাঁড়াক।’