কান চলচ্চিত্র উত্সবে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশের

রেহানা মরিয়ম নূর

আনন্দ বিনোদন প্রতিবেদক

 

বিশ্ব চলচ্চিত্রের তীর্থভভূমি দক্ষিণ ফরাসি উপকূলীয় শহরে গত ৬ জুলাই সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২৫ মিনিট) ৭৪তম কান উত্সবের পর্দা উঠেছে। পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনের গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরের মঞ্চে উদ্বোধন ঘোষণা করেন দক্ষিণ কোরিয়ার পরিচালক বঙ জুন হো। এতদিন কান চলচ্চিত্র উত্সবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল প্যারালাল বিভাগ ‘ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট’-এ মনোনয়ন ও পুরস্কার পাওয়া। এবার তাকেও ছাড়িয়ে গেল ‘রেহানা মরিয়ম নূর’।

২০০২ সালে প্যারালাল বিভাগ ‘ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট’-এ মনোনয়ন পেয়ে সমালোচক পুরস্কারও জিতেছিল তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। তবে ৭৪তম আসরে প্যারালাল নয়, অফিসিয়াল বিভাগ ‘আঁ সার্তেইন রিগার্দ’-এ  স্থান পেয়ে গেছে তার এই ছবি।  অভূতপূর্ব এই অর্জনকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য ‘দুর্দান্ত’ বলছেন ২০০২ সালের কান উত্সবের ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট বিভাগের বিচারক আহমেদ মুজতবা জামাল। রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি মুজতবা মনে করেন, তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অর্জনের ইতিহাসের প্রথম ধাপ হয়, তবে সাদের ‘আঁ সার্তেইন রিগার্দে’ মনোনীত হওয়া পরবর্তী ধাপে পৌঁছে যাওয়া, যা ভীষণ গর্বের ও আনন্দের।

এবারের আসরে ‘আঁ সার্তেইন রিগার্দ’ বিভাগে ১৫টি দেশের ১৮টি ছবি মনোনীত হয়েছে। তালিকার ১৩ নম্বরে আছে সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর’  ছবিটি। ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে— বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক রেহানা মরিয়ম নূরকে কেন্দ্র করে। সেখানে রেহানা একজন মা, মেয়ে, বোন ও শিক্ষক। এক সন্ধ্যায় কলেজ থেকে বের হয়ে তিনি এমন এক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন, যা তাকে প্রতিবাদী করে তোলে। এক ছাত্রীর পক্ষ হয়ে সহকর্মী এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য হন রেহানা। একই সময়ে তার ৬ বছরের মেয়ের বিরুদ্ধে স্কুল থেকে রূঢ়  আচরণের অভিযোগ করা হয়। এমন অবস্থায় রেহানা তথাকথিত নিয়মের বাইরে থেকে সেই ছাত্রী ও তার সন্তানের জন্য ন্যায় বিচার খুঁজতে থাকেন। ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন সাদ নিজেই। ছবির গল্পকে মৌলিক গল্প দাবি করে রেহানা মরিয়ম নূর চরিত্রে অভিনয় করা আজমেরী হক বাঁধন বলেন, ‘একটা তারুণ্যনির্ভর টিম, যারা সীমানা পেরিয়ে কিছু করতে চেয়েছিল, এ অর্জন সেই ইচ্ছেরই প্রকাশ বলা যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘এমন কিছু প্রত্যাশিতই ছিল। কারণ, আমরা অনেক কষ্ট করেছি সততার সঙ্গে এই সিনেমার জন্য।’

পোটোকল ও মেট্রো ভিডিও’র ব্যানারে ছবিটি প্রযোজনা করেছেন সিঙ্গাপুরের জেরেমি চুয়া। নির্বাহী প্রযোজক এহসানুল হক। সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন তুহিন তুমিজুল। সহ প্রযোজনা করেছে ‘সেন্সমেকারস প্রোডাকশন’। ছবিতে আরো অভিনয় করেছেন আফিয়া জাহিন জাইমা, কাজী সামি হাসান, আফিয়া তাবাসসুম বর্ণ, ইয়াছির আল হক, সাবেরী আলম। ২০১৬ সালে ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’  সিনেমা দিয়ে যাত্রা শুরু পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের। ২৭তম সিঙ্গাপুর ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে সেরা পরিচালকের পুরস্কার ‘সিলভার স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড’ জিতেছিল ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’। পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনের সাল দুবুসি প্রেক্ষাগৃহে গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা ১৫ মিনিটে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনী শুরুর আগে হাজির হন পরিচালক সাদ। তার সঙ্গে ছিলেন আজমেরী হক বাঁধন, প্রযোজক জেরেমি চুয়া, নির্বাহী প্রযোজক এহসানুল হক বাবু, চিত্রগ্রাহক তুহিন তমিজুল, প্রোডাকশন ডিজাইনার আলী আফজাল উজ্জ্বল, শব্দ প্রকৌশলী শৈব তালুকদার এবং কালারিস্ট চিন্ময় রয়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য গতকাল বুধবার ছিল আনন্দের একটি দিন। কান চলচ্চিত্র উত্সবে অংশ নিতে আসা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবাদকর্মীরা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ দেখেছেন। তারপর থেকেই ছবিটির পর্যালোচনা আসতে শুরু করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।