কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও সাইবার বুলিংয়ের আদ্যোপান্ত

বাংলাদেশে ব্যক্তি পর্যায়ে ভিডিও নির্মাণ ট্রেন্ডের পথচলা ইউটিউবের হাত ধরে শুরু হলেও বর্তমানে ফেসবুক, টিকটক, লাইকির মতো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে নিজেকে তুলে ধরার অন্ধ খ্যাতির মোহে বিভোর হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। এসব মাধ্যমে কিছু মানুষ সফল হলেও বেশির ভাগই না বুঝে একপ্রকার ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে।

ভিডিও নির্মাতাদের সব থেকে পছন্দের যায়গা হচ্ছে ইউটিউব। তবে সমস্যা হলো, ইউটিউবের জন্য ভিডিও নির্মাণ অন্য যে কোনো মাধ্যমের তুলনায় কিছুটা ব্যয়সাপেক্ষ। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মানের দিক দিয়ে ছাড় দিলে চলে না এই প্ল্যাটফরমে, যে কারণে কিছুটা ভালো মানের ক্যামেরা কিংবা মোবাইল ফোনের দরকার পড়ে। পাশাপাশি দরকার পড়ে বিভিন্ন দামি ক্যামেরা অ্যাক্সেসরিজের। এ ছাড়া পেশাদার দক্ষতা থাকতে হয় ভিডিও এডিটিংয়ের। আর ইউটিউবের জন্য তৈরি ভিডিওগুলো হতে হয় কিছুটা দীর্ঘ সময়ের, যার জন্য প্রয়োজন হয় ভালো গল্পের। এসব কঠিন বিষয় অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে টিকটক, লাইকির মতো মাইক্রোভিডিও প্ল্যাটফরমগুলো। যে কারণে উচ্চবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত, এমনকি নিম্নবিত্ত ঘরের তরুণেরাও খুব সহজেই ভিডিও কিংবা কনটেন্ট তৈরি করতে পারছে। এ পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। তবে সমস্যার শুরু হয় যখন সস্তা খ্যাতির মোহে তরুণেরা কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল ভিডিও তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়ে। এসব নিম্নমানের কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, তখন তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ভিডিও নির্মাতারা ট্রল কিংবা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন। পাশাপাশি এসব ভিডিও সংগ্রহ করে আরো হাস্যরসাত্মকভাবে এবং অপমানজনকভাবে উপস্থাপন করছে আরেক দল ভিডিও নির্মাতা। রোস্টিং ভিডিওর নামে প্রকাশ করা হচ্ছে এসব ভিডিও। কিন্তু অপমান এখানেই থামছে না। ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়ে গেলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের আক্রমণের স্বীকার হচ্ছে তারা। এসব ভিডিওর মন্তব্যে অনেকেই গালিগালাজ করে থাকে, যা সহ্য করার মতো মানসিক শক্তি অনেকেই রাখেন না। এতে করে একপর্যায়ে হতাশা ও বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করে তারা। অনেক সময় সেটি রূপ নেয় আত্মহত্যার মতো ভয়ানক পরিস্থিতিতে।

এখানেই শেষ নয়। উঠতি বয়সের অনেক তরুণ-তরুণী টিকটক, লাইকির মতো প্ল্যাটফরমে নিম্নমানের ভিডিও তৈরি করার পাশপাশি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে মাদক, কিশোর গ্যাং কিংবা মানব পাচারের মতো ভয়ানক অপরাধের সঙ্গে। কিছুদিন আগেই টিকটকার হূদয় বাবুর ঘটনা ভাইরাল হয় দেশে। এতে চমকে ওঠে পুরো দেশ। দোষ যে পুরোটা ভিডিও নির্মাতাদের এমন নয়। মারাত্মক সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন অনেক মেধাবী ভিডিও নির্মাতাও। অর্থাত্, দর্শকও নিজেদের পছন্দ মতো ভিডিও না পেলে এড়িয়ে যাচ্ছেন না, সেই ভিডিও নির্মাতাকে অপমান করে ছাড়ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ রকম আক্রমণের শিকার হয়ে অনেকেই হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করেন। ফলে অনেক প্রতিভাবান ও মেধাবী নির্মাতাও ভালো মানের ভিডিও তৈরিতে উত্সাহ হারিয়ে ফেলেন। আবার অনেকে শুরু করলেও নিজেকে তুলে ধরার আগেই এই জগত্ থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

সমাধানস্বরূপ উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। ভিডিও নির্মাতাদের বুঝতে হবে, কুরুচিপূর্ণ ভিডিও নির্মাণ করে সফলতা পাওয়া যায় না। আর দর্শকদেরও গঠনমূলক সমালোচনা করা শিখতে হবে। অনেকেই টিকটক কিংবা লাইকির মতো অ্যাপ্লিকেশনগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলে থাকেন। তবে এটা বুঝতে হবে, বর্তমান যুগে ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক)-এর কারণে এসব উদ্যোগ খুব একটা সফলতার মুখ দেখে না। পাশপাশি প্রতিনিয়তই নতুন নতুন অ্যাপ্লিকেশন তৈরি হচ্ছে। তাই একটি বন্ধ করলেও আরেকটি আসতে খুব বেশি সময় নেবে না। এসব ক্ষেত্রে সামাজিক সচতনতা ও মনিটরিং সব থেকে বেশি দরকার। আমাদের অভিভাবকেরা ইন্টারনেট জগতের সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত না থাকায় তারাও সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেন না। তাই এই সামাজিক সমস্যার সমাধানে সমাজের সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়