স্মৃতিচিত্রণ :শঙ্খ ঘোষ

করোনা অতিমারির রাক্ষুসে দাপট দেশে দেশে যে কত মানুষের প্রাণই এ পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে! কেড়ে নেবে যে আরো কত, আমাদের তা কল্পনাতে আসছে না। ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে আজ এই জুলাই পর্যন্ত বিশ্বে মোট মৃতের সংখ্যা চল্লিশ লাখ ছাড়িয়েছে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে এর বেশ কয়েক গুণ।

সম্প্রতি এই করোনাতেই প্রয়াত হলেন বিখ্যাত কবি-প্রাবন্ধিক-অনুবাদক-অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষ। নবজাতক থেকে নব্বই কাউকেই রেহাই দেয় না করোনা। সমতলে ও পাহাড়ে, এমনকি এভারেস্টের মতো উচ্চতাতেও পৌঁছে গেছে এ রোগ।

শঙ্খ ঘোষ এবং তাঁর স্ত্রী, আটদিনের ব্যবধানে প্রয়াত হলেন করোনার আক্রমণে। পিতামাতার মৃত্যুকে বলে মহাগুরুনিপাত। তেমনি শিক্ষালাভ করা যায় যাঁর/যাঁদের কাছে, তিনি/তাঁরাও পিতৃসম, মাতৃসমা। তাই তাঁদের মৃত্যুও মহাগুরুনিপাত। শঙ্খ ঘোষ আমার শিক্ষক ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই হিসেবে তাঁর মৃত্যুও আমার কাছে মহাগুরুনিপাত, যেমন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের মৃত্যু। যদিও অলোকরঞ্জন করোনায় মারা যাননি।

আজ শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ছে তাঁর ধীর ও বিশিষ্ট বাচনভঙ্গির কথা, তাঁর তির্যক হাসি, পথে যেতে যেতে মাঝে মাঝেই হাত দিয়ে ধুতির কোঁচা সামলানো, স্যারের বারোমাস দুগ্ধফেননিভ ধুতিপাঞ্জাবি, আর তাঁর কান্তিময় চোখ।

তাঁর মধ্যে দেখেছি অন্য এক পরশুরামকে। সমাজ ও রাষ্ট্রের যাবতীয় অন্যায় মূঢ়তা পশুত্ব বিপন্নতা ও বেবন্দোবস্ত, তাঁর কবিতায় তার প্রতিবাদ। পঞ্চাশের দশকে কোচবিহারে খাদ্য-আন্দোলনের মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত কিশোরীকে নিয়ে তিনি যেমন লিখেছিলেন ‘যমুনাবতী’, সেই থেকে পরবর্তী সাত দশক ধরেই যেকোনো গজব তাঁর সহ্যাতিরিক্ত ছিল। তিনি রাস্তায় নেমেছেন, পত্রিকায় অকম্প বিবৃতি দিয়েছেন, লিখেছেন একের পর এক প্রতিবাদী কবিতা। মানুষটি খুব স্বাস্থ্যবান ছিলেন না, কিন্তু অপহ্নবের বিরুদ্ধে তাঁর আগ্নেয়তা সম্ভ্রম জাগায়। মেরুদণ্ড কোনো কারণেই নত করেননি, আপোষ করেননি কদাপি কোনো হীন প্রলোভনের কাছে। অনেকেই হয়তো জানেন না, আনন্দবাজার পত্রিকাগোষ্ঠী তাঁকে দু-দুবার কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। ’৬২-তে চীন-ভারত যুদ্ধে চীনের বিরুদ্ধে তাঁকে লিখতে বলা হয়েছিল। তারাশঙ্কর, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, লিখেছিলেন আরো অনেকে। মৃনাল সেন এবং মনোজ বসুর তখন নাজুক অবস্থা। ‘হিন্দি চীনা ভাই ভাই’-এর যুগে মৃণাল সেন ‘নীল আকাশের নীচে’ বানালেন। প্রখ্যাত হিন্দি লেখিকা মহাদেবী বর্মার ছোট গল্পটির নায়ক কলকাতার এক চীনা ফেরিওয়ালা। ছবিটি নিয়ে বহু হ্যাপা পোহাতে হয়েছিল মৃণাল সেনকে। অন্যদিকে মনোজ বসু চীন ঘুরে এসে লিখলেন ‘চীন দেখে এলাম’, যে বইতে চীনদেশ ও চীনাদের বহু সুখ্যাতি ছিল। এমন পরিস্থিতিতে শঙ্খ ঘোষের আনন্দবাজারকে নাকচ করা দুঃসাহসের কাজ ছিল। পরে আবার ঐ পত্রিকাতেই কর্মীদের দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে পত্রিকা বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল, কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তাঁকে লিখতে বলা হয়। শঙ্খ ঘোষ লেখেননি, সমর্থন করেছিলেন কর্মচারী-আন্দোলন। এজন্য দীর্ঘদিন দেশ তাঁর কবিতা ছাপেনি।

প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে গেলে কতখানি আগ্নেয় দক্ষিণা দিতে হয়, সফদার হাশমি বা গৌরী লঙ্কেশের নিহত হওয়ার ঘটনা থেকে তা তিনি ভালোভাবেই জানতেন। নকশাল আমলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর এক প্রিয় ছাত্র তিমির সিংহকে বহরমপুর জেলে লাঠিপেটা করে মেরে ফেলা হয়েছিল, তিনি জানতেন। কিন্তু আজানুলম্বিত রবীন্দ্র-অনুধ্যায়ী শঙ্খ ঘোষের জীবন-এষণা যে তারে বাঁধা ছিল তা হলো, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।’ জমি হারানো নন্দীগ্রামের কৃষকদের সপক্ষে তিনি, কামদুনিকাণ্ডে পথে নামেন। ২০১৩-র ৭ জুন বারাসতের কামদুনিতে ২১ বছর বয়সী এক কলেজ ছাত্রীকে ন জন মিলে দলবদ্ধভাবে করে মেরে ফেলে। এরই প্রতিবাদে যে মিছিল বেরোয়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেনের সঙ্গে সে-প্রতিবাদ মিছিলে শঙ্খ ঘোষও সামিল হন। তাই জীবিতকালে তিনি ছিলেন জাগ্রত বিবেক। পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে কবিতা ছিল তাঁর হাতিয়ার, যেমন ছিল রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুভাষ মুখোপাধ্যায়-সুকান্ত-শামসুর রাহমানের।

মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। এ মূল্যবোধ প্রাথমিকভাবে তিনি অর্জন করেন পারিবারিকসূত্রে। তাঁর বাবা মনীন্দ্র কুমার ঘোষ যে শিক্ষকতা করতেন তা-ই নয়, সারস্বত সাধনার সূত্রে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মতবিনিময় হতো তাঁর। বাংলা বানান নিয়ে মতদ্বৈততা ছিল তাঁদের মধ্যে, যে ঘটনা পাবো আমরা মনীন্দ্র কুমারের ‘সাময়িকী’ গ্রন্থে। ঈশ্বরদীর চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। দেশভাগের পর কলকাতায় চলে যান। কঠিন অর্থ-কৃচ্ছ্রতার মধ্যে দীর্ঘদিন বৃহত্ পরিবার নিয়ে কাটিয়েছেন, আর সন্তানদের গড়ে তুলেছেন যথার্থ মেধাবী ও সাহিত্যমনা করে। তাঁরা চার ভাই। শঙ্খ ঘোষ (প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয়) ছাড়াও অন্য দু ভাইয়ের একজন নিত্যপ্রিয় ঘোষ প্রাবন্ধিক হিসেবে খ্যাতিমান, আর অন্য এক ভাই সত্যপ্রিয় ঘোষ ছিলেন ছোটগল্পকার।

পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সাহিত্যপাঠ, কবিতা প্রবন্ধ রচনা এবং অধ্যাপনা, এবং সদা-সর্বদা রবীন্দ্রশরণ গড়ে তুলেছিল তাঁকে। তবে সাহিত্য নিয়ে তাঁর অনুসন্ধিত্সা কেবল রবীন্দ্রনাথেই নয়, ব্যাপ্ত ছিল বাংলা, ভারতীয় তথা বিশ্বসাহিত্যে। তিনি অনুবাদ করেন একদিকে দক্ষিণ ভারতীয় নাট্যকার গিরিশ কার্নাডের নাটক, অন্যদিকে মারাঠি বিজয় তেন্ডুলকর, উর্দু ভাষী ইকবাল। ভিক্টোরিয়া-রবীন্দ্রনাথ সম্পর্ক নিয়ে তাঁর গবেষণা তো সবাই জানি আমরা। হ্যাঁ গবেষণা, যেমন গবেষণামূলক কাজ হিসেবে তাঁর ‘নির্মাণ আর সৃষ্টি’ বা ‘কবির অভিপ্রায়’সহ বেশ কিছু গ্রন্থের নাম উল্লেখ করতেই হয়। অথচ মজার কথা, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি কখনো পি.এইচডি করেননি। যদিও তাঁকে নিয়ে অন্যরা করেছেন।

ওঁর কবিতা-আবৃত্তি যারা শুনেছেন মন দিয়ে, অভিনয় আর আবৃত্তির পার্থক্য তাদের কাছে স্পষ্ট হবে। আমাদের তিনি পড়াতেন ‘মেঘনাদবধ’। অক্ষরবৃত্তের মর্যাদা রক্ষাই ছিল তাঁর লক্ষ্য, নাটকীয়তা তৈরি নয়। তাঁর কণ্ঠে বাণীবদ্ধ হয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা, ‘একটি রক্তিম মরীচিকা’ নামে ক্যাসেটে। এছাড়া দিল্লির সাহিত্য অকাদেমি তাঁর ওপর যে তথ্যচিত্র তুলেছে, সেখানে স্বরচিত কবিতার আবৃত্তি রয়েছে তাঁর। আবৃত্তিকারদের অনুসরণযোগ্য।

শঙ্খ ঘোষ কিন্তু ছিলেন আবার বিনয়ের প্রতীক। সকলের সঙ্গে শীলিত কণ্ঠে কথা বলতেন। আমার স্ত্রীও ওঁর এমএ ক্লাসে দু বছর ছাত্রী ছিল। খুব স্নেহ করতেন তাকে। চিঠিও দিয়েছেন পরবর্তী সময়ে। আমার স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই দেশ, অমৃত, কৃত্তিবাস, বিচিত্রায় (ঢাকা) কবিতা লেখার সুবাদে প্রিয় ছিল স্যারের। একবার এক চিঠিতে ওকে লিখেছিলেন, ‘এবার থেকে তোমরা লিখবে, আমি পড়ব।’ এসব কি নিতান্ত বিনয়বচন নয়?

নব্বই বছর বেঁচে ছিলেন স্যার। তবু কষ্ট হচ্ছে তাঁর প্রয়াণ মেনে নিতে।