দিলীপ কুমার :নক্ষত্র উজ্জ্বল হয়ে জন্মায় না, তাকে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে হয়!

দিলীপ কুমারের প্রয়াণে অমিতাভ বচ্চন তার এক টুইটে তিনি উল্লেখ করেছেন-এক প্রতিষ্ঠানের প্রয়াণ ঘটলো! ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস যখন লেখা হবে তাঁর নামের আগে বা পরে সেটা এভাবেই বিবেচিত হবে! হয়ত ভারতের এক অনলাইন পত্রিকার শিরোনামই সত্য-একজন দিলীপ কুমার এর জন্য এরপর কয় শতাব্দী অপেক্ষা করতে হবে?

প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে হয়তো তিনি মৃত্যুর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু হিন্দী ফিল্মের অগণিত দর্শককে তিনি অপেক্ষা করিয়ে রাখতে পেরেছিলেন! মানুষ অপেক্ষা করে থাকতো দিলীপ কুমারের নতুন ছবির জন্য! মৃত্যু যে সব কিছু থামিয়ে দিলো পত্রিকার শিরোনাম হবার জন্য, সেখানেও বলা হচ্ছে এখন- দিলীপ কুমারের মতো অভিনেতা আর সহসা পাওয়া যাবে না। নক্ষত্র উজ্জ্বল হয়ে জন্মায় না ,তাঁকে ক্রমশ:উজ্জ্বল হয়ে উঠতে হয়!

দিলীপ কুমার এর উজ্জ্বল নক্ষত্র হবার কথা ছিল না। বোহেমিয়ান এক অভিমানী মানুষ, প্রেমের রঙে রঙীন এক ‘দেবদাস’ হবার কথা ছিল (পরে অবশ্য ছবি ও বাস্তবে একাধিকবার দেবদাস হয়েছিলেন)। অথচ বাবার সাথে অভিমান করে বাড়ি ছেড়েছিলেন, হয়ে উঠছিলেন বাবার মত ব্যবসায়ী। বাবা ছিলেন অবিভক্ত ভারতের পেশোয়ারের এক অবস্থাসম্পন্ন ব্যবসায়ী। বাড়ি ছাড়ার সময়ে বাবার কাছ থেকে কিছুই নেন নি জেদ আর অভিমান ছাড়া। বাড়ি থেকে পালানোর পর তাঁর মনে হয়েছিল পুনাতেই তার ভালো লাগতে পারে! পুনাতে যেয়ে খুঁজে পেলেন এক হোটেল মালিক আর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান দম্পতি কে। তাদের ভালোবাসায় ক্যান্টনমেন্টের পাশের সৈনিক ক্লাবের সাথে এক স্যান্ডউইচের দোকান খুললেন। যে আসতো স্যান্ডউইচ খেতে, দিলীপের চোখে চোখ রাখলেই সে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেত। মানুষটা কথা বলতেন হূদয় উজাড় করে। উর্দু, হিন্দী আর ইংরেজি বলতে পারতেন দারুণ। ব্যবসা দাঁড় করাতে সময় লাগলো না দিলীপ কুমারের! এই স্যান্ডউইচের দোকানেই একদিন এলেন মি.মাসানি! চোখ আটকে যেতে থাকলো তার! মাসানীই প্রথম বুঝলেন পেশোয়ার থেকে আসা ‘ইউসুফ খান’ এর ঠিকানা স্যান্ডউইচের দোকানে নয়। মাসানী তাকে নিয়ে গেলেন ‘বম্বে টকিজে’র অফিসে। শুরু হলো ইউসুফ খানের ছবির গল্প বাছাই ও ছবির পান্ডুলিপি তৈরি করার কাজ। হিন্দী আর উর্দু খুব ভালো জানার কারণে স্যান্ডউইচ ব্যবসার মতো এই কাজেও নাম করে ফেললেন ইউসুফ খান।

এরপর একদিন। অভিমানী যুবক কিংবা সর্বহারা প্রেমিক হয়েছেন অনেকবার। দেবদাস হতে চেয়েছিলেন একসময়। তার আগে হিন্দী ফিল্মে প্রথমে বড়ুয়া পরিচালিত দেবদাস এর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সায়গল। কিন্তু দিলীপ কুমার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর  প্রথম নায়িকা দেবিকা রানীকেও। তাদের প্রেম তেমন পাখা মেলে নি। ১৯৪৮ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘শহীদ’। এই ছবির নায়িকা কামিনী কৌশলের সাথে তার প্রেম বলিউড কাঁপিয়ে দিয়েছিল! হিন্দী ফিল্মের কাহিনীর মতো কামিনীর বাবা দিলীপকে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। তাদের মিলন হয় নি। কামিনী তার প্রয়াত বড় বোনের স্বামীকে বিয়ে করেছিলেন বোনের দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে!

দিলীপের প্রেম পর্বের সবচেয়ে বড় বলী ‘মধুবালা’! সাত বছরের প্রেম ছিল তাদের। সবাই চাইতো তাদের মিলনটা যেন হয়। প্রেমের আজব খেয়াল। ১৯৬০ সনে মধুবালা বিয়ে করেন গায়ক কিশোর কুমারকে আর দিলীপকুমার হয়ে যান ‘দেবদাস’! সবাই ধরে নিয়েছিল দিলীপকুমার আর কখনো প্রেম বা বিয়ের পথে পা বাড়াবেন না। অকাট্যভাবে এটা বিশ্বাস করেছিলেন মধুবালা নিজেও! কিন্তু ঐ যে প্রেমের বিচিত্র খেয়াল! ৪৪ বছরের দিলীপকুমার বিয়ে করেন ২২ বছরের সায়রা বানুকে কিন্তু মধুবালা ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেন নি। দিলীপ সায়রার বিয়ের তিন বছরের মাথায় অকালে প্রয়াত হন মধুবালা। কিছু কিছু প্রেমের গল্প সিনেমার গল্পকেও হার মানায়, দিলীপ আর মধুবালার প্রেমের গল্প ছিল তেমনই! সবাই বাজি ধরে বলেছিল সায়রা বানু আর দিলীপকুমারের সম্পর্ক টিকবে না। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে পাঁচ দশকের বেশি সময় টিকেছিল তাদের সংসার। মৃত্যুকালে ‘দেবদাসের’ জন্য এক চিলতে জল চোখে পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন সায়রা বানু!

হিন্দী ফিল্মে দিলীপের দেবদাস দেখে চোখে জল আসে নি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। পাওয়া যাবে না তার জন্মান্তরের কাহিনী নিয়ে করা ছবি মধুমতিতে তার অভিনয় দেখে চমকায় নি এমন মানুষ! আনন্দ আর দেবেন চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন অসামান্য মমতায়! তপন সাহেবের ছবি ‘সাগিনা মাহাতো’ তে এক শ্রমিক নেতার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। হিন্দী ও নেপালি ভাষার সংমিশ্রণের ডায়ালগে অসাধারণ এই একটি চরিত্রই বািঁচয়ে রাখতে পারে দিলীপকুমারকে।

অভিনয়ে তার অর্জনও কম নয়। অগনিত পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় অর্জন মনে হয় তাঁকে নিয়ে লেখক ও পরিচালক সত্যজিত্ রায়ের মূল্যায়ন। গডফাদার খ্যাত মার্লোন ব্রান্ডোকে একরকম তুচ্ছ করে সত্যজিত্রে মূল্যায়ন ছিল-মেথোডিকাল অভিনেতা হিসেবে দিলীপের জুড়ি মেলা ভার। দুর্ভাগ্য তাকে জন্ম নিতে হয়েছিল ইন্ডিয়ায়!

এই ইন্ডিয়ার মুম্বাইয়ের সান্তাক্রুজ কবরস্থানেই শেষ শয্যা হবে দিলীপকুমারের। দুর্দান্ত অভিমান, না পাওয়া প্রেমের কষ্ট আর সায়রার অশ্রুসিক্ত মুখটার স্মৃতি নিয়ে কবরেই হয়তো ঢাকা পরবে তার পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট! হয়তো মধুবালা কখনোই জানবেন না যে ‘মুঘলে আযমে’র শাহজাদা সেলিম শেষমেষ কবরে ঘুমুবে! মানুষ ভাববে এক নক্ষত্রের জীবনাবসান হলো আজ। তবে যতদিন যাবে স্মৃতি আর জমে থাকা ছবির দ্যুতিতে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন দিলীপ কুমার!

লেখক : কথা সাহিত্যিক, অনুষ্ঠান প্রধান-বৈশাখী টেলিভিশন