একদিনেই আপিল বিভাগে তিন ফাঁসির মামলার শুনানি

দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এক দিনেই শুনানি হলো তিন ফাঁসির মামলা। এর মধ্যে এক মামলায় শিশু হত্যার দায়ে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আর স্ত্রী হত্যা মামলায় স্বামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে কিনা তা জানা যাবে ১২ জুলাই। ঐ দিন ফাঁসির আসামি স্বপন কুমারের আপিলের উপর রায় ঘোষণা করবে আদালত।

এছাড়া শুনানি শুরু হয়েছে ল্যাব এইডের চিকিৎসক ডা. নাজনীন আক্তারসহ গৃহকর্মী হত্যা মামলার। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে গতকাল বৃহস্পতিবার এসব ফাঁসির আসামির আপিলের উপর চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত ও রায় প্রদান করা হয়। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন, বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান, বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।

করোনা সংক্রমণ রোধে সরকার সারাদেশে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেয়। ঐ ঘোষণার পরই প্রধান বিচারপতি সপ্তাহে দুইদিন আপিল বিভাগে ভার্চুয়ালি বিচার কাজ পরিচালনার কথা বলেন। ঐ বেঞ্চে শুধুমাত্র ফাঁসির মামলার আসামিদের জেল আপিলের শুনানি গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের আইনজীবীদেরকে জানান। আর এই ভার্চুয়ালি কোর্ট বাসা থেকে পরিচালনার নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনা মোতাবেক গত তিন দিন ফাঁসির মামলার আসামিদের জেল আপিলের  উপর শুনানি গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। গতকাল শুনানি গ্রহণ করা হলো তিন মামলার। রায় ঘোষিত হয়েছে একটির। যেখানে আপিলকারী আসামি জাহাঙ্গীরের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে।

এ ধরনের আসামিকে ছেড়ে দেওয়া যায় না: প্রধান বিচারপতি
নোয়াখালীর মাইজদী হাফেজিয়া নুরানী মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন আরাফাত হোসেন (৯)। দুই পরিবারের মধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায় কাঠমিস্ত্রি জাহাঙ্গীর (২৬)। ২০০৭ সালের ১৩ জুলাই স্থানীয় কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে দা দিয়ে কুপিয়ে ঐ শিশুকে হত্যা করে সে। এ ঘটনায় সুধারামপুর থানায় নিহতের পিতা বাবুলের করা মামলায় ২০০৮ সালের ২৮ জুলাই নোয়াখালীর জেলা ও দায়রা জজ আদালত আসামি জাহাঙ্গীরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০১৩ সালে হাইকোর্ট ঐ মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখে। এই রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল করেন আসামি। আপিলের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌসুলি এবিএম বায়েজীদ ও রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এসএম মুনীর শুনানি করেন।

শুনানির এক পর্যায়ে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. ইমান আলী বলেন, নয় বছরের একটি শিশু। অপরাধীকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তো তার ভেতরে হয়নি। সেই শিশুটির শরীরের এমন কোন স্থান বাকি নেই যেখানে দা দিয়ে কোপানো হয়নি। প্রধান বিচারপতি বলেন, এ ধরনের অপরাধীকে ছেড়ে দিলে বেরিয়ে গিয়ে আরও ২/১টা খুন করতে পারে। পরে আপিল বিভাগের সকল বিচারপতির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আসামির আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের ফাঁসির রায় বহাল রাখার ঘোষণা দেন প্রধান বিচারপতি।

ডা. নাজনীন হত্যা মামলার শুনানি শুরু:
ল্যাব এইডের চিকিৎসক ছিলেন ডা. নাজনীন আক্তার। তার স্বামী আসারুজ্জামান আপন ভাগ্নে আমিনুলকে ঢাকায় আনেন লেখাপড়া করানোর জন্য। ভর্তি করেন মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে। কিন্তু  ২০০৫ সালের ৭ মার্চ হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর  নাজনীনকে কুপিয়ে হত্যা করেন  ভাগ্নে আমিনুল। পারুল নামের গৃহকর্মী তা দেখে ফেলায় তাকেও কুপিয়ে হত্যা করে সে। এরপর সে বগুড়ায় চলে যায়। সেখান থেকে ফরিদপুরে। কয়েকদিন পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ধানমন্ডি থানায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় ২০০৮ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০১৩ সালে হাইকোর্ট ঐ রায় বহাল রাখে। এর বিরুদ্ধে আপিলের উপর গতকাল শুনানি শুরু হয়েছে। শুনানিতে আসামি পক্ষে অংশ নেন রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌসুলি এবিএম বায়েজীদ।

শুনানিতে তিনি বলেন, সুবিচার ও মানবিকতার স্বার্থে আপনারা (বিচারপতি) যেটা ভালো মনে করবেন সেই সিদ্ধান্ত নেন। কারণ আসামি যদি বেরিয়ে লেখাপড়া করে মানুষ হতে পারে?

এ পর্যায়ে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা বলেন, কোনটিকে মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে বলছেন। যিনি এই মামলায় নিহতের একজনকে ১৮টি কোপ দিয়েছেন। আরেকজনকে দিয়েছেন সাতটি। এমনভাবে আক্রমণ করেছেন ঐ চিকিৎসক কোন ধরনের প্রতিরোধ করতেই পারেননি। এ পর্যায়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিত দেবনাথ বলেন, ঐ চিকিৎসকের দুহাত জুড়ে কোপের দাগ। আর আঙ্গুলগুলো ছিলো বিচ্ছিন্ন। এরপরই আগামী ১২ জুলাই পর্যন্ত শুনানি মুলতুবি করে আপিল বিভাগ। ঐদিন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ফাঁসি বহাল রাখার পক্ষে যুক্তিতর্ক তুলে ধরবেন বিশ্বজিত দেবনাথ।

স্ত্রী হত্যা মামলায় স্বপন কুমারের আপিলের রায় ১২ জুলাই

স্ত্রী হত্যার দায়ে ১৪ বছর ধরে কারাগারের কনডেম সেলে আছেন নীলফামারীর স্বপন কুমার বিশ্বাস। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করেছেন জেল আপিল। ঐ আপিলের উপর শুনানি শেষে ১২ জুলাই রায়ের জন্য দিন ধার্য রেখেছেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। আসামির পক্ষে শুনানি করেন ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তাকে সহায়তা করেন মোহাম্মদ শিশির মনির। খন্দকার মাহবুব আসামির পক্ষে বিনা পয়সায় মামলা লড়েছেন।

খন্দকার মাহবুব বলেন, কারাগার থেকে স্বপন কুমার নামে ঐ ফাঁসির আসামি অনেক কাকুতি-মিনতি জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে তিনি লেখেন, তিনি দরিদ্র মানুষ। আইনজীবী রেখে মামলা পরিচালনা করার সামর্থ্য তার নেই। এ কারণে তার মামলাটি বিনামূল্যে পরিচালনা করছি। রাষ্ট্রপক্ষের ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোরসেদ।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, প্রথম স্ত্রী স্বপ্না ঘোষকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা নিয়ে ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর পারিবারিক কলহের এক পর্যায়ে স্ত্রীর মাথায় আঘাত করেন স্বপন। এতে স্বপ্না ঘোষ মারা যান। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০০৮ সালে নীলফামারীর জেলা ও দায়রা জজ আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০১৪ সালে হাইকোর্ট ঐ রায় বহাল রাখে। এর বিরুদ্ধে আপিল করে আসামি। 

ইত্তেফাক/এমএএম