ক্ষতিটা খালি চোখে দেখা যাচ্ছে না

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারির প্রাদুর্ভাবে বিগত ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে অদ্যাবধি দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক প্রকার বন্ধ হয়ে আছে। স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম। মহামারির কারণে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহ রক্ষা করতে সরকারকে নানা উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে ছাত্রছাত্রীদের ঘরে অবস্থানের কারণে বিভিন্নমুখী সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা খেলাধুলা, শরীরচর্চার যথেষ্ট পরিবেশ না পাওয়ায় শারীরিকভাবে যেমন সুস্থ মানুষ হয়ে উঠতে পারছে না, তেমনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগবঞ্চিত হয়ে মানসিকভাবেও বিকশিত হয়ে উঠতে পারছে না। শিক্ষা কার্যক্রমকে চলমান রাখার উদ্দেশ্যে স্কুল-কলেজসহ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে এবং শিক্ষার্থীদের অনলাইন সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক পার্থক্য (যা ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ নামে পরিচিত) থাকার কারণে এসব উদ্যোগ কতটুকু কার্যকর হতে পেরেছে, তার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ দরকার। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকার কারণে বিষণ্নতার পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের ডিভাইস-নির্ভরতা এবং ডিভাইস-আসক্তির জন্ম দিয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের যথার্থ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হলে পুরো ব্যাপারটা উঠে আসত। তবে অতিরিক্ত ডিভাইস-নির্ভরতার কারণে আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে উঠছে বলেই মনে হচ্ছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে ক্লাসরুম সরঞ্জাম, ছাত্রাবাস সামগ্রীর ব্যাপক অবচয় হচ্ছে। তবে এসব সমস্যা বিশাল হিমশৈলের দৃশ্যমান সামান্য চূড়ামাত্র। সমস্যার বিশাল হিমশৈলটি এখনো দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। কী পরিমাণ ছাত্রছাত্রী তাদের শিক্ষাকার্যক্রম থেকে ঝরে পড়ছে, বাল্যবিবাহের হার কত—এসব পরিসংখ্যান এখনো আমাদের হাতে এসে পৌঁছেনি। সর্বোপরি, একটি মেধাভিত্তিক ও জ্ঞানভিত্তিক যে সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন আমরা দেখি, সেটির ভবিষ্যত্ নিয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে। না হলে মেধাশূন্য ও জ্ঞানশূন্য একটি ভবিষ্যত্ হয়তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

এই মহামারিতে আমাদের সবাইকেই যুদ্ধ করতে হচ্ছে। কেউ সম্মুখ সারির যোদ্ধা, কেউ মধ্য সারির, আবার কেউ-বা পেছনের সারির যোদ্ধা। এই যুদ্ধের কৌশল হিসেবে এবং শিক্ষাসংকট উত্তরণের লক্ষ্যে কতিপয় বিনীত প্রস্তাবনা সুধী সমাজের কাছে ব্যক্ত করতে চাই।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল :প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলসমূহে নিম্নোক্ত উপায়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমিয়ে নিয়ে স্কুল খোলা যেতে পারে—ক) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলসমূহ বন্ধ না রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আংশিকভাবে খোলা রাখা যেতে পারে। শিক্ষক, কর্মচারীদের টিকা দিয়ে সপ্তাহের প্রত্যেক দিন একটি শ্রেণির জন্য স্কুল খোলা যেতে পারে। যেমন, প্রাথমিক স্কুলে সপ্তাহে এক দিন পঞ্চম শ্রেণির, অন্য দিন চতুর্থ শ্রেণির জন্য—এইভাবে পাঁচ দিন পাঁচ শ্রেণির জন্য খোলা যেতে পারে। খ) একশ্রেণির ছাত্রছাত্রীর বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে ভাগ করে দিয়ে বিস্তর শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে কোনো একটি শ্রেণিকক্ষে বাংলা, অন্য কোনো শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি, অন্য কক্ষে গণিত বিষয়ের ক্লাস চলতে পারে। পরের পিরিয়ডে অন্য বিন্যাসে বিভিন্ন কক্ষে বিভিন্ন বিষয়ের পাঠদান চলতে পারে। এভাবে প্রত্যেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাসে অংশ নিতে পারে, তা ছাড়া সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব। গ) সুবিধা থাকলে শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে স্কুলের মাঠ, গাছতলা বা অন্য কোনো উন্মুক্ত স্থানেও বিস্তর শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস নেওয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ঘ) একই প্রক্রিয়ায় মাধ্যমিক স্কুলসমূহের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির ক্লাস বিস্তর শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে পরিচালনার কথা ভাবা যেতে পারে।

উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠান :বিগত বছর থেকে দেশের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালু হয়েছে। সমস্যা রয়েছে মূলত পরীক্ষা গ্রহণ এবং ব্যাবহারিক ক্লাস পরিচালনার ক্ষেত্রে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সবেমাত্র ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। এহেন অবস্থায় কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে আংশিক খোলা রেখে পরীক্ষা অনুষ্ঠান এবং ব্যবহারিক ক্লাস ও পরীক্ষা নিয়ে নেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে। কোনো একটি বিশেষ বর্ষের এবং বিশেষ বিশেষ বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সময়ে আবাসিক হলসমূহ সংশ্লিষ্টদের টিকা দিয়ে খুলে দিয়ে বিস্তর শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে পরীক্ষা নিয়ে নেওয়া যেতে পারে। পরবর্তীকালে অন্য সময়ে অন্য বর্ষের এবং অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল খুলে দিয়ে একই পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কথা বিবেচনা করা যায়।

এভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমসংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে বিস্তর শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ায় সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোভিড-১৯ এড়ানো সম্ভব। সম্ভব ক্ষেত্রে ক্লাসরুম/পরীক্ষাগার ব্যতিরেকে মুক্ত স্থানে বিস্তর শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে আসন বিন্যাস করেও উপরিউক্ত কাজ সম্পাদন করা যেতে পারে।

পাবলিক পরীক্ষাসমূহ :স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসএসসি, এইচএসসিসহ অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষা সংশ্লিষ্টদের টিকা দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে নেওয়ার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের পরীক্ষাসমূহ বিস্তর শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে আলাদা দিনে নেওয়া যেতে পারে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের পরীক্ষাসমূহ বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্রে নেওয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে বিভিন্ন বিভাগের পরীক্ষা আলাদা দিনে নিলেও কোনো সমস্যা না হয়। এমনিভাবে সব পাবলিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে ফেলা যেতে পারে, যাতে করে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক তথা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের মতামত নিয়ে শিক্ষা-সংকট উত্তরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সাম্প্রতিক সময়ের একান্ত দাবি।

n লেখক :অধ্যাপক, ইলেকট্রনিকস

অ্যান্ড কম্যুনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন,

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়