সিনেমাটা তখনই সফল হবে যখন মানুষ এটা নিয়ে ভাববে: সাদ

কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশনে প্রথমবার বাংলাদেশের নাম যুক্ত করেছেন। ইতিহাস গড়েছেন। আঁ সার্তে রিগায় জায়গা করে নিয়েছে তার দ্বিতীয় ছবি ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। কিন্তু এতো বড় অর্জনের পরও নিজেকে ক্যামেরার আলো থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। আড়াল ভাঙছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়ে যাওয়া এই তরুণ নির্মাতা। ভূমধ্যসাগরের তীরে পালে দে ফেস্টিভালের মাঝে সরাসরি কথা বলেছেন ইত্তেফাক অনলাইনের সঙ্গে।

ইত্তেফাক অনলাইন: কান উৎসব। অফিসিয়াল সিলেকশন। আঁ সার্তে রিগা। আর কী লাগে! বাংলাদেশকে প্রথমবার এই সম্মান এনে দিয়েও আড়ালে ছিলেন এতদিন। রেহানা মরিয়ম নূর-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পর কথা বলতে রাজি হলেন। আপনি কি এটাই চেয়েছিলেন? মানে ছবিটি মানুষ আগে দেখুক তারপর কথা বলবেন।

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ: ছবিটা দেখার পর কনভারসেশনটা অনেক মজার হয়। ছবি দেখার আগে বেশি কথা হয় অনুভূতি নিয়ে। এটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ কি না আমি জানি না। আমি এখনো নার্ভাস। আর অ্যাটেনশন হ্যান্ডেলিং করা আমার জন্য একটু কঠিন। আমার চেয়ে ছবিটাই বেশি অ্যাটেনশন পাক সেটাই চাই। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে মিডিয়ার বাইরে থাকাই ভালো।

ইত্তেফাক অনলাইন: ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর আগ পর্যন্ত কানের অফিসিয়াল সিলেকশন আমাদের কাছে স্বপ্ন ছিলো। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে সেটা সত্যি হলো। কান উৎসবের যাত্রা প্রসঙ্গে জানতে চাই। ছবি জমা দেওয়ার সময় কি ভেবেছিলেন এটা অফিসিয়াল সিলেকশন পেতে পারে?

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ: আমরা সবাই খুব চিন্তিত ছিলাম। মানুষ কীভাবে এটা নিবে। এরপর যেটা ঘটলো সেটা আসলে বিশ্বাস্য। এটা স্ক্রিনিং হলেই আমি খুশি হয়ে বাড়ি ফিরে যেতাম। এছাড়া মঞ্চে ওঠার আগে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে এসেছিলাম কিন্তু তেমন কিছুই বলতে পারিনি।

ইত্তেফাক অনলাইন: পালে দ্য ফেস্টিভালের সাল দুবুসিতে কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমোর ডাকে মঞ্চে ওঠা, ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পর স্ট্যান্ডিং ওভেশন, বিভিন্ন দেশের আলোকচিত্রীদের সামনে ফটোকলে থাকা, কেমন অনুভূতি হচ্ছিলো এসব মুহূর্তে?

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ: এই অনুভূতি আসলে বলে বোঝানোর মতো না। আমি কখনো চিন্তাও করিনি আমরা এতদূর পর্যন্ত আসতে পারবে। এখনকার প্রত্যেকটি পদে পদে যে অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, যতটুকু পাওয়া সব জীবনের প্রথম। আর সব সম্ভব হয়েছে আমাদের টিমের কারণে। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ।

ইত্তেফাক অনলাইন: ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’র পুরোটা সাদাকালো রঙে বানিয়েছেন। এবার ব্যবহার করেছেন নীল রঙ। এর কারণ কী? আমরা জানি, বেদনার রঙ নীল হয়। রেহানার যন্ত্রণা ও বেদনাকে প্রতিটি ফ্রেমে একীভূত করতেই কি তাহলে এই রঙ বেছে নেওয়া?

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ: আমার যখন ছবিটির কালার-স্ক্রিন নিয়ে কথা বলছিলাম তখন আমার বিষয়বস্তু একটু আলাদা ছিল। কীভাবে রেহানার চরিত্রটা ফুটে উঠবে, অনেক ইনফরমেশন না দিয়ে খুব সহজেই ফুটিয়ে তুলতে পারবো। আলোচনার মাধ্যমেই তখন এই নীল রঙটাকেই পছন্দ করি।

ইত্তেফাক অনলাইন: রেহানা মরিয়ম নূরের হিজাব নিয়ে কথা বলতে চাই। পর্দায় তাকে নামাজ আদায় করতেও দেখেছি। পরীক্ষার হলে নকল কিংবা যৌন হয়রানি মানতে না পারা একজন নারীকে পর্দানশীন হিসেবে উপস্থাপন না করলে কি দর্শকদের কাছে তার চরিত্রের গুরুত্ব কমতো?

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ: এটা আসলে আমার দর্শক বিচার করবে। আমি আবারও আমার সেই কথায় ফিরে যাচ্ছি, আমি আমার লাইফে ওকে যেভাবে দেখেছি ঠিক সেভাবে ওকে পোট্রেট করার চেষ্টা করেছি। কীভাবে পোট্রেট করলে এটা দর্শকের কাছে পোট্রে করবে সেই ক্যালকুলেশন থেকে আমি এই কাজটা করিনি। আমি আমার আশেপাশে অনেক মেয়েদের দেখেছি। যখন দূর থেকে আজানের আওয়াজ আসতো তখন তারা মাথায় কাপড় দিতো। এই রকম ছোট-খাটো বিষয় লাইফ থেকেই নেওয়া।

ইত্তেফাক অনলাইন: একজন পুরুষ নির্মাতা হয়ে নারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে ছবিটির আঙ্গিক সাজানো কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিলো? আপনি সেটা করতে কী কী কাজে লাগিয়েছেন?

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ: আমি আসলে কী চাই, কোন প্রশ্নগুলো তুলে আনতে চাই সেটাই মূল ব্যাপার। আমার কাছে যে স্ট্রাগল ছিলো- আমি এমন কোন ছবি বানাতে চাই যেটা ফিগার আউট করা। সেটা করতে আমার দুই/আড়াই বছর সময় লেগেছে। একটা সময় এসে বাঁধন যখন যুক্ত হয়, ওর সাথে আলোচনা করার পর আরও অনেক বিষয় উঠে এসেছে। শেষে যখন আমার কাছে মনে হয়েছে এটা আমি বানাতে চাই তখন পুরোদমে কাজ শুরু করেছি।

ইত্তেফাক অনলাইন: বাঁধন মনপ্রাণ দিয়ে কাজটি করেছেন। নয় মাস মহড়াতেই সময় দিয়েছেন তিনি। সেই প্রসঙ্গে বলবেন। আর ফ্রান্স টোয়েন্টিফোরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাকে পর্যাপ্ত সম্মানী দিতে পারেননি। বাঁধন কত টাকা সম্মানী নিয়েছেন?

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ: তাকে যে সম্মানী দেওয়া হয়েছে সেটা পর্যাপ্ত ছিল না। বাঁধন এই কাজটি না করে অন্যকেউ কাজ করলে সে অনেক বেটার থাকতো। এটা ওর পছন্দ। ও চেয়েছে সবকিছু বাদ দিয়ে আমাদের এই প্রজেক্টটি করবে। আমি অনেক খুশি ওর এই ত্যাগ শেষ পর্যন্ত সার্থক হয়েছে।

ইত্তেফাক অনলাইন: ছবিটির রঙ, শব্দসহ সবকিছুতে বাংলাদেশের মানুষরাই কাজ করেছেন। আবহসঙ্গীত সাজিয়েছে কার্নিভাল ব্যান্ড। তারা সবাই সেরাটা দিয়েছেন। টাকার অভাব না থাকলে কি এসব কাজ করাতে দেশের বাইরে যেতেন? নাকি আপনি শুরু থেকে এটাই চেয়েছিলেন?

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ: একদমই না। প্রথমে আমি একটি বিষয় বলে রাখতে চাই, টেকনিক্যাল টিম এখানে যারা আছেন আমি তাদের বাইরে কারো সঙ্গে কাজ করিনি। সুতরাং এটা কোটি কোটি টাকার ছবি হলেও এই টিমটাই থাকতো। আমাদের সবার মাঝে যে বোঝাপড়া/বিশ্বাস সেটা অনেক বছর ধরে তৈরি করা। আমি তাদের উপর অনেকটা নির্ভরশীল। কারণ আমার কাছে এতো মেধাবী টিম থাকতে কেনো আমি অন্যদের কাছে যাবো। 

ইত্তেফাক অনলাইন: বাংলাদেশে যা পর্যবেক্ষণ করেছেন তা নিয়েই গল্পটি লিখেছেন। রেহানাকে মি-টু মুভমেন্টের বিজয়ী দেখাননি। বিজয়ী দেখালে কি ছবিটি দুর্বল হয়ে পড়তো? নাকি এটাই বাস্তব চিত্র?

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ: নিজেকে পলিটিক্যাল পরিচালক মনে করি না। অবশ্যই এটা কোনো পলিটিক্যাল ইনটেনশন থেকে ছবিটি বানাইনি। রেহেনাকে ফলো করছিলাম শুধু। সুতরাং ওকে পুশ করতে গিয়ে, ওকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্লেস করতে গিয়ে আমার কাছে যে প্রশ্নগুলো এসেছে আমি সেটাই করেছি। আমার মনে হয় ছবিটা তখনই সফল হবে যখন এটা নিয়ে মানুষ ভাববে।

ইত্তেফাক/বিএএফ