বিশ্ব জনসংখ্যা কোন দিকে যাচ্ছে?

হাজার হাজার বছরের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম শেষে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বের জনসংখ্যা ১০০ কোটিতে উন্নীত হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে করতে একসময় পৃথিবীর জনসংখ্যা কয়েক হাজারে নেমে এসেছিল। সেই মহাসংকটকালে মানুষ জ্ঞান-বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল। একের পর এক বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও আবিষ্কার মানুষের বেঁচে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করে। মানুষ ক্ষুধা, ভয়, রোগশোক মোকাবিলা করে মানবসভ্যতার বিকাশে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে।

গোষ্ঠীগত স্বার্থে, সম্পদ রক্ষায়-অর্জনে, খুন-মারামারি, যুদ্ধবিগ্রহ আর মহামারিতে বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে বড়ো ধরনের কোনো সমস্যা তৈরি করতে পারেনি। মাত্র ১৮৭ বছরের ব্যবধানে  ১৯৮৭ সালে  পৃথিবীর জনসংখ্যা ৫০০ কোটিতে উন্নীত হলো। জাতিসংঘ ১৯৮৭ সালে সাধারণ অধিবেশনে ৪৫/২১৬ রেজুলেশন মোতাবেক ১১ জুলাইকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে গ্রহণ করে।  জ্ঞান-বিজ্ঞান আর চিকিত্সায় নতুন নতুন আবিষ্কার মানুষের দীর্ঘ জীবন লাভে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করছে। পৃথিবীর জ্ঞানী-গুণী, শাসক-গবেষক, পণ্ডিত-অধ্যাপকবৃন্দ জনসংখ্যার মারাত্মক বিস্ফোরণে আঁতকে উঠলেন। কীভাবে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তা নিয়ে শুরু হলো গবেষণা-পরিকল্পনা। অবশেষে সিদ্বান্ত হলো জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে।  মানুষ মূলত তিনটি কারণে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকে—এক. যৌনসুখ, দুই. বংশরক্ষা এবং তিন. বৃদ্ধ বয়সে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

চারদিকে আওয়াজ উঠল—দুটি সন্তানই যথেষ্ট। শিশুর আগমন ঠেকাতে ১৯৭৯ সালে চীন এক সন্তান নীতি কঠোরভাবে চালু করে। ২০২০ সালে চীনে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৪৯ লাখ বেশি ছিল। বিপুলসংখ্যক যুবকের বিপরীতে অপেক্ষাকৃত কমসংখ্যক যুবতী সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশ্বে ১৯৭০ সালে  নারী গড়ে সন্তান জন্ম দিত ৪ দশমিক ৫ জন আর ২০১৫ সালে  জন্ম দিয়েছে ২ দশমিক ৫ জন। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা, থাইল্যান্ড, জার্মানি ও গ্রিসে জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। জাতিসংঘের মতে, পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে ২০২১ সালের শেষে ৭৯০ কোটি, ২০৩০ সালে ৮৫০ কোটি, ২০৫০ সালে ৯৭০ কোটি আর ২১০০ সালে হবে ১ হাজার ৯০ কোটি। সম্প্রতি বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত গবেষণা রিপোর্ট ল্যানচ্যাটে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, একটা নির্দিষ্ট  সময় পরে প্রথিবীর জনসংখ্যা আর বাড়বে না, বরং কমতে থাকবে। সেটা হয়তো দূর ভবিষ্যতের বিষয়।

গবেষকেরা বলছেন, ২০৬৪ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে ৯৭৩ কোটি আর ২১০০ সালে হবে ৮৭৯ কোটি। ২১০০ সালে প্রবীণ  (৬৫+) জনসংখ্যা হবে ২৩৭ কোটি আর ২০ বছরের নিচে তরুণ জনসংখ্যা হবে ১৭০ কোটি। বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই,  ২০২০ সালে জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ আর ২০২১ সালে  ১৬ কোটি ৯১ লাখ। জন্মহার ছিল যথাক্রমে ২০১৯ সালে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ২০২০ সালে ১ দশমিক ৩২ শতাংশ, ২০২১ সালে ১ দশমিক ৩০ শতাংশ।  বিপুলসংখ্যক প্রবীণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য, চিকিত্সা, ওষুধপত্র, বাসস্থান, সেবা, সুপেয় পানি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। প্রবীণদের সেবাযত্ন নিশ্চিত করতে বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষিত স্বাস্থসেবাকর্মী লাগবে। ফলে কৃষি উত্পাদনে, কলকারখানায়, সেবা খাতে শ্রম ঘাটতি দেখা দেবে। তবে একটি সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কোনো কোনো দেশে জনসংখ্যার সংকট এবং কোনো কোনো দেশে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ। ফলে দেশভেদে জনসংখ্যানীতির বাস্তবায়ন প্রয়োজন হবে। তথ্যসূত্র : ল্যানচেট, জাতিসংঘ রিপোর্ট, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান

n লেখক :গবেষক