বড় ভূমিকা রেখেছে শুকনো খাবার
রেজাউল হক কৌশিক
বাংলাদেশ থেকে কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি শত কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। আর কৃষি পণ্য রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে শুকনো খাবার। বিশ্বব্যাপী করোনার প্রভাবে উত্পাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে সাপ্লাই চেইনেও (সরবরাহব্যবস্থা) বড় আকারের ধাক্কা লেগেছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি বেড়েছে। রপ্তানি আরো বাড়াতে হলে মান (কমপ্লায়েন্স) ঠিক রেখে নতুন নতুন বাজার উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা করতে হবে। তাতে একদিকে যেমন দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে, তেমনি বিশ্ববাজারে দেশের মর্যাদাও বাড়বে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে (২০২০-২১) ১০২ কোটি ৮১ লাখ ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটার পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৯ ভাগ বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে শুকনো খাবার। গত অর্থবছরে ২৮ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের শুকনো খাবার রপ্তানি হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ২ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৬ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। আর গত অর্থবছরে মসলা রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ৩২ লাখ ডলার। ্বএছাড়া অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের চেয়ে ২৭ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি।
তথ্যমতে, বাংলাদেশে তৈরি শুকনো খাবারের চাহিদা রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। প্রবাসী বাঙালিরা এসব খাবারের মূল ক্রেতা হলেও এর প্রতি আগ্রহ রয়েছে বিদেশিদেরও। দেশে তৈরি শুকনো খাবার বেশি রপ্তানি হয় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশ থেকে শুকনো খাবার হিসেবে যেসব পণ্য রপ্তানি হয়, তার মধ্যে রয়েছে মুড়ি, চিড়া, চানাচুর, আলুর চিপস, বিস্কুট, খই প্রভৃতি।
দেশের রপ্তানি পণ্যের বাজার বাড়াতে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) কাজ করছে। অন্য পণ্যের চেয়ে কৃষিপণ্য তুলনামূলকভাবে বেশি পচনশীল। এজন্য এসব পণ্য দূরদূরন্তে পাঠানোর জন্য ব্যবস্থাপনা এখনো ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি। কীভাবে পণ্য পাঠানোসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনা করা যায়, নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করার জন্য করণীয়, পণ্যের প্যাকেজিং, অন্য দেশে যাতে পণ্য স্ক্যানিং না করা লাগে সেজন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি বা উদ্ভাবন, পণ্য পরিবহনের ভাড়া কমানোর উপায় প্রভৃতি নিয়ে এখনো আমাদের দেশে সেভাবে কোনো গবেষণা নেই। পরীক্ষাগারও গড়ে ওঠেনি। ফলে কৃষিপণ্য রপ্তানির যে সম্ভাবনা, তা বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি করতে এসব কাজ করা জরুরি।
আমাদের দেশের রপ্তানিকারকেরা রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক বেশি লাভ (প্রফিট মার্জিন) করতে চান। ফলে কপ্লায়েন্স পরিপালন না করেই অনেক ক্ষেত্রে পণ্য রপ্তানি করে দেন। অনেক ক্ষেত্রেই নন-কপ্লায়েন্স চালান বাতিল হয়ে যায়। তাতে লাভের পরিবর্তে উলটো ক্ষতিতে পড়েন। নিজের সঙ্গে সঙ্গে এই খাতের এবং দেশের ক্ষতি করেন। পণ্যের গুণগত মানসংক্রান্ত নন-কমপ্লায়েন্সের কারণে রপ্তানির চালান বাতিল হওয়া শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, দেশের জন্যও তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আর সেই প্রভাব কাটিয়ে উঠতে অনেক ক্ষেত্রেই সময়সাপেক্ষ ও কঠিন হয়ে পড়ে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কৃষিপণ্যের ১ হাজারেরও বেশি চালান বাতিল হয়ে গেছে। অর্থাত্, গড়ে প্রতি বছর শতাধিক চালান বাতিল হয়ে গেছে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে পণ্যের মানের দিকে নজর দেওয়ার বিকল্প নেই।
ইপিবির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, লন্ডন, কানাডা, দুবাই, ইতালিসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ৫০টিরও বেশি দেশে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। মূলত, বাংলাদেশিরাই এসব পণ্যের ভোক্তা। তারা যেসব জায়গায় বেশি থাকে, সেসব দেশেই আমাদের দেশ থেকে বেশি কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। বাংলাদেশিদের বাইরেও বিদেশিদের আমাদের দেশের এসব পণ্যের ভোক্তা করা গেলে তা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।
দেশের প্রধান কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে চা, সবজি, ফুল, ফল, মসলা, শুকনো খাবার ইত্যাদি। আলু, ধনিয়া পাতা, লাউশাক, বরবটি, কাঁকরোল, করল্লা, ঝিঙে, লালশাক, বেগুন, টমেটো, পটল, কচু, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়া, লাউ, পেঁপে, কলা, শসা, শিম, বাঁধাকপি, মরিচ, মুলাসহ অর্ধশতাধিক সবজি দেশ থেকে রপ্তানি হয়।
ইপিবির তথ্যে দেখা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০৭ কোটি মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ১০২ কোটি ৮১ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) কৃষি খাতে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে ১১০ কোটি ডলার।