সেজান জুস কারখানা ট্র্যাজেডি

কেমিক্যাল ও তেলে ঠাসা ছিল প্রতিটি ফ্লোর

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আগুনে ভস্মীভূত সেজান জুস কারখানার সামনে নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের আহাজারি যেন থামছে না। অনেককে ভবনের বিভিন্ন স্থানে নিখোঁজ আপনজনদের খুঁজে বেড়াতে দেখা গেছে। তাদের চিত্কারে কারখানা এলাকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কারখানার ধ্বংসস্তূপের ভিতর লাশের সন্ধানে তল্লাশি চালান। কারখানার ফ্লোরে থাকা দাহ্য পদার্থ ও ধ্বংসস্তূপ থেকে গতকাল শনিবারও ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে।

অন্যদিকে, সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৫২ শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পর্যায়ের আট কর্মকর্তাকে চার দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। ঐ আট কর্মকর্তা হলেন সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল হাশেম, তার ছেলে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসিব বিন হাশেম, অন্য তিন ছেলে তারেক ইব্রাহিম, তাওসিফ ইব্রাহিম, তানজিব ইব্রাহিম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহান শাহ আজাদ, ডিজিএম মামুনুর রশীদ ও অ্যাডমিনপ্রধান মো. সালাউদ্দিন। শনিবার বিকালে পুলিশ পরিদর্শক আসাদুজ্জামান আট কর্মকর্তাকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠান। নারায়ণগঞ্জ আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ফাহমিদা খাতুন চার দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।

এর আগে শনিবার সকালে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন মজুমদার বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় সজীব গ্রুপের আট জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় হত্যা ও হত্যার উদ্দেশ্যে সামান্য ও গুরুতর জখম করার অভিযোগ আনা হয়।

কারখানা ধ্বংসস্তূপ

হাশেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজের চারটি ভবনের প্রতিটিতে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা রয়েছে। একটি কমপ্লায়েন্ট কারখানা বলতে যা বুঝায় তার ছিটেফোঁটাও ছিল না হাশেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজে।

অগ্নিকাণ্ডে সেজান জুস কারখানা ভবনের সবকটি ফ্লোর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ফ্লোরে ফ্লোরে এখনো নিভে যাওয়া আগুন থেকে তীব্র ধোঁয়া এবং তাপ বের হচ্ছে। আছে কেমিক্যাল পোড়া উত্কট ঝাঁজালো গন্ধ। গতকাল ফায়ার সার্ভিসকে কেমিক্যাল পোড়া ধোঁয়ায় পানি ছিটিয়ে বন্ধ করতে দেখা গেছে। কারখানার প্রতিটি ফ্লোর ৩৪ হাজার বর্গফুট আয়তনের। প্রতিটি ফ্লোরে এক শিফটে ৭০০ শ্রমিক কাজ করেন। বিশাল ফ্লোরে শ্রমিকদের ওঠানামার জন্য দুই প্রান্তে মাত্র দুটি সিঁড়ি রয়েছে। কারখানায় কাজ চলাকালে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, সরু দুই সিঁড়ি দিয়ে শ্রমিকরা বের হতে গেলে আবারও দুর্ঘটনা ঘটবে। কারখানা ভবনের বাইরে দিয়ে জরুরি বহির্গমনের কোনো সিঁড়ি নেই। প্রতিটি ফ্লোরে নেই কোনো ফায়ার স্টুইংগুইসার। নিচতলায় আগুন নেভানোর জন্য জরুরি পানির পাইপ লাগানো ছিল, তাও সরু।

প্রতিটি ফ্লোর কেমিক্যালে ঠাসা

ভবনের ছয়তলায় ছিল কার্টনের গুদাম। কিছু কার্টন ছিল জুস তৈরির রাসায়নিক কাঁচামাল। আর পঞ্চম তলায় রাখা হতো বিভিন্ন রাসায়নিক ও প্লাস্টিক মোড়ক। চতুর্থ ও তৃতীয় তলায় উত্পাদিত হতো সেজান জুসের বিভিন্ন পণ্য। তবে পণ্য উত্পাদনের পাশাপাশি পাশেই সারি সারি রাখা ছিল পণ্যভর্তি কার্টন। তৃতীয় তলায় ক্যান্ডি লাইন নসিলা উত্পাদনের প্ল্যান্ট। এ ফ্লোরে ছিল যাবতীয় ফ্লেভার, সুগার ও গ্লুকোজ কার্টন এবং মোড়ক উত্পাদনের পলিথিন।

চতুর্থ তলায় স্টোরসহ লাচ্ছা সেমাই, চানাচুর, আচার, ঝালমুড়ি তৈরি হতো। তবে এই  ফ্লোরে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেলের ড্রাম ছিল। ইলেকট্রিক চুলায় বড় সাইজের চার-পাঁচটি কড়াই ছিল। ঘটনার সময় কড়াইয়ে আচার তৈরির কাজ চলছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর ফুটন্ত তেল ও ড্রামভর্তি তেল জ্বলে গিয়ে ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। এসব কয়েক ঘণ্টা ধরে জ্বলে পুড়ে লাচ্ছা সেমাই, চানাচুর, আচার, ঝালমুড়ি ছাই হয়ে গেছে।

নিচ তলায় ছিল প্লাস্টিকের পলি উত্পাদন প্ল্যান্ট। এখানে আরেকটি স্থানে প্রসেস করা হতো ময়দা। ছিল কম্প্রেসার মেশিন। রাখা ছিল ফয়েল পেপারের বড় বড় রোল। পাশেই ছিল আঠা জাতীয় রাসায়নিক উপাদানের প্লাস্টিকের কয়েকটি ড্রাম। দ্বিতীয় তলায় লিচু ড্রিঙ্কস ও লাচ্ছি তৈরি হতো। তৈরি হতো এসব পণ্যের প্লাস্টিক বোতলও। ছিল প্লাস্টিক পণ্য উত্পাদনের কাঁচামাল রেজিনের মতো দাহ্য পদার্থ। নিচতলা ছিল সব ড্রিঙ্কস ও বিস্কুট উত্পাদন প্ল্যান্ট। এখানে বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ মজুদ ছিল। মূলত পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার দুটি ফ্লোরে গুদাম হিসেবে রাখা হলেও সবকয়টি  ফ্লোরেই ছিল রাসায়নিক উপাদান ভর্তি কার্টন, প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে ঠাসা।

জড়িত কাউকে ছাড় নয় :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘সারা দেশ এ ঘটনায় স্তব্ধ। একসঙ্গে এতজনের প্রাণহানি খুবই দুঃখজনক। ঘটনায় সামান্যতম জড়িত, গাফিলতি কিংবা কারো অজান্তে ত্রুটি করে থাকলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

কারখানায় আগুনে নিহতদের বেশির ভাগই শিশু। এতে শিশুশ্রমের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কতজন শিশু শ্রমিক ছিল তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ১৭ জনকে ছাদ থেকে বড় একটি মই দিয়ে উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। সিঁড়িতে ও ছাদে তালা দেওয়া ছিল কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। শনিবার বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি বলেন, আগুনের ঘটনায় অপরাধীদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান শুক্রবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, আগুনে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে শ্রম কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে ২ লাখ টাকা ও আহতদের উন্নত চিকিত্সার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।

আহত তিন শ্রমিককে অর্থ সহায়তা :

শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ২০৩ ও ২০৪ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিত্সাধীন তিন নারী শ্রমিককে ৫০ হাজার টাকার চেক প্রদান করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ কে এম আব্দুস সালাম। আহত শ্রমিকরা হলেন, আমেনা বেগম, মাজেদা বেগম ও হালিমা আক্তার।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ কে এম আব্দুস সালাম বলেন, যারা জীবন বাঁচাতে ওপর থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মারা গেছেন তাদের পরিবারকে ২ লাখ টাকার চেক প্রদান করেছি। পর্যায়ক্রমে আহত সবাইকে ৫০ হাজার টাকা করে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে সহায়তা করা হবে।