নগর পরিকল্পনায় নকশা প্রণয়নে দরকার টেকসই কাঠামো

এক আলোচনাসভায় বক্তারা বলেছেন, ঢাকা শহরের সব গ্যাসলাইনে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর লাগানোর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে একটা নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পুরোনো গ্যাসলাইনগুলো জরুরি ভিত্তিতে পুনঃসংস্কার বা পরিবর্তন করতে হবে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে নির্বিচারে ভবনে কাচের ব্যবহার হ্রাস বা রোধ করতে হবে। আমাদের ফায়ার হাইড্রান্ট ব্যবস্থা নেই, তাই দ্রুত অঞ্চলভিত্তিক ফায়ার হাইড্রান্ট স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। ভবন নির্মাণের সময় সব নিয়ম মানা হলে সিটি করপোরেশন থেকে বিশেষ রেয়াতের ব্যবস্থা করতে হবে, অন্যথায় আইনানুযায়ী শাস্তি দিতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা নগরের ওপর চাপ কমানোর জন্য ঢাকার বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যার একটি অংশকে ঢাকার বাইরে আশপাশে তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই মোতাবেক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। গতকাল ‘মগবাজারে বিস্ফোরণ :নগর নকশা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক বিশেষজ্ঞদের আলোচনাসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। জটিল বিষয়ের সমস্যা, কারণ ও করণীয় নিয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এই আলোচনাসভার আয়োজন করে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে স্থপতি ও নগর নকশাবিদ মোহাম্মদ জাকারিয়া ইবনে রাজ্জাক মগবাজার ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, ডিজাইনকৃত ভবনের কংক্রিটের কলাম ও ছাদ তাত্ক্ষণিক দুর্ঘটনার উত্সকে প্রতিরোধ করতে পারেনি। সাধারণ ব্যবহার্য গ্লাস-ওয়াল কোনো প্রতিরোধ করতে পারেনি। গ্লাসের কারণে বহুদূর পর্যন্ত বহু লোক হতাহত হয়েছেন। দুর্ঘটনা ত্রিমাত্রিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, টেকনিক্যাল লোকজনকে আরবান ডিজাইনে সম্পৃক্ত করতে হবে। নগর গঠন কাঠামো লোক দেখানোতে আবদ্ধ না রেখে, শুধু দর্শনীয় কাঠামো গড়ে না তুলে নিরাপদ, স্থিতিশীল কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অংশীজনদের নগর নকশা পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করতে হবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, যখন একটি দুর্ঘটনা ঘটে তখন সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব এড়িয়ে চলে। এখানে ফায়ার ব্রিগেড আইন এখনো অনুন্নত, ফলে একটা বৈপরীত্য দেখা যায় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে। বিএনবিসি, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এবং ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানের কোনো রকম তদারকি নেই। তারা শুধু অনুমোদন দেয়, আর কোনো কাজে নেই ফলে নানারকম সমস্যা সৃষ্টি হয়। ইমারত বিধিমালার অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ১২ বছরেও যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি, এটি খুবই দুঃখজনক। আধুনিক শহরের জমির ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে, নইলে নিমতলীর মতো ঘটনা ঘটবে। সবাইকে আইন মেনে ভবন নির্মাণে সচেষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও স্থপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী নকী বলেন, যারা সতর্কতা অমান্য করবে তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। গ্যাসলাইনের ব্যবস্থা নিরাপদ ও নিশ্চিত করতে হবে। পুরাতন ভবনে ত্রুটি থাকতে পারে, সেটা ধ্বংস না করেও ক্রটি মুক্ত করা যায়।

পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ব্যক্তিগত এবং দলগত লোভ-লালসা পরিহার করে সবার বসবাস নিরাপদ করার ব্যাপারে সঠিক আইনি প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নগর নকশা পরিকল্পনা করার বিষয়ে প্রভাবশালী মহলের চাপকে উপেক্ষা করতে হবে। আলোচনাসভা সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব আর্কিটেকচারের চেয়ারম্যান স্থপতি সাজ্জাদুর রশীদ। আলোচক ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ান গভর্নমেন্টের পরিবেশ, ভূমি, পানি ও পরিকল্পনা বিভাগের সিনিয়র পরিকল্পনা ও অনুমোদন কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ ইজাজ, প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বিএসভিসিএফআইসিএ, পবার সম্পাদক এম এ ওয়াহেদ রাসেল, কবি কামরুজ্জামান ভুঁইয়া, গ্রীনফোর্স সমন্বয়ক ও পবার সম্পাদক মেসবাহ সুমন প্রমুখ।