রিফাত বিনেত জিয়া
জীবনটা সুন্দর, একে উপভোগ করতে হবে, অনেক বাধা আসবে অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে সুন্দর জীবনটা সুন্দরভাবে উপভোগ করতে হবে। আর এই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেই অনেকের মন সব সময় সায় দিতে চায় না। কারণ মানিয়ে নেওয়ার দায়িত্বটা সব সময় মেয়েদের ওপরই এসে পড়ে।
আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে একজন মা যখন চাকরি করেন, সবকিছু ভালোভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে তার মানিয়ে নেওয়ার পাল্লাটা অনেক ভারী হয়ে যায়। কারণ পিতৃতান্ত্রিক এই সমাজে বাচ্চা লালনপালনের দায়ভার যেহেতু মায়ের, সেহেতু সবকিছু মানিয়ে নিয়ে, চাকরিটা চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও তার। বর্তমানে কর্মজীবী বাবাদেরকেও সংসারে নানা রকম ভূমিকায় দেখা যায় যা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু বাবা-মা দুজনই যখন কর্মক্ষেত্রে চলে যান, তখন একান্ত ভাগ্যবান শিশুরা আপনজনদের সঙ্গে থাকার সুযোগ পায়। অন্যথায় কখনো তাদের থাকতে হয় গৃহপরিচারিকার কাছে, অথবা কখনো থাকতে হয় ডে-কেয়ার সেন্টারে। ভালো মানের ডে-কেয়ার সেন্টারের সংখ্যা আবার আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। আর সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করেও যখন কোনো কুলকিনারা পাওয়া যায় না তখন আমাদের সামাজিক অবকাঠামো অনুযায়ী চাকরিটা ছাড়তে হয় মায়েরই আগে।
যেসব কর্মজীবী অভিভাবক তাদের সন্তানদের গৃহপরিচারিকার কাছে বা ডে-কেয়ার সেন্টারে রেখে যান, তাদের চেয়ে অনেক বেশি ভাগ্যবান যারা আপনজনের কাছে সন্তানকে রেখে যেতে পারেন। সেই আপনজন অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় মা অথবা যৌথ পরিবারের সদস্যরা। মায়ের কাছে রেখে যেতে পারলে তুলনামূলক কর্মজীবী মায়েদের পারিবারিক ঝামেলা কম হয়। আর যৌথ পরিবারে রেখে গেলে বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক সমস্যা দেখা যায়।
যৌথ পরিবারগুলোতে যখন একজন নারী বউ হয়ে আসেন তখন ধীরে ধীরে তিনি সংসারটাকে চান তার মতো করে সাজাতে। আবার যিনি এতদিন এই জায়গাটা পরিচালনা করে এসেছেন তিনিও এখানে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নন। তাই দুয়ের মধ্যে ছোটখাটো ঝামেলা লেগেই থাকে। বউ যদি হন কর্মজীবী মা তাহলে ক্ষমতার সম্পর্কে তিনি পিছিয়ে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। আর সেই চাকরি যদি পরিবারের জন্য খুব একটা প্রয়োজন না হয় তাহলে তো কথাই নেই। সোজা হিসাব ‘তোমার এত সমস্যা! সবকিছু তোমার পছন্দমতো হতে হবে! এত যখন নিজের মতো চাও তাহলে চাকরি ছেড়ে দাও’। আর যদি সংসারে এই টাকার প্রয়োজন থাকে তাহলে একই কথা হয় কিন্তু একটু মোলায়েমভাবে বলা হয়।
এভাবেই চলছে, আর সমাধান একটাই; নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, নিজের মনকে সান্ত্বনা দেওয়া যে, আমার সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ আমার সন্তানরা নিরাপদে আছে। কিন্তু সন্তান তো একা মায়ের না, সন্তান তাদের বাবারও। কিন্তু বাবাদের তো আর এই চিন্তার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না! তাই দিন শেষে দীর্ঘ নিঃশ্বাস—মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়া, এটাই হয়তো আমাদের দেশের কর্মজীবী মায়েদের জীবন। পরিবর্তনের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকা।
লেখক :জেন্ডার এক্সপার্ট
ছবি :ইন্টারনেট