শিফারুল শেখ
১ কোটি ১০ লাখ মানুষের দেশ হাইতি পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ। এর প্রেসিডেন্ট জোভলেন ময়েস জীবন শুরু করেন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে। ২০১৭ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৯ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বিরোধ দেখা দেওয়ায় তা পিছিয়ে যায়। ময়েসের মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং ডিক্রি জারি করে এক বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করছিলেন। তার চার বছরের শাসনামলে ছয় বার প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছে। সর্বশেষ নিহত হওয়ার আগের দিন সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এরিয়েল হেনরিকে নিয়োগ দিলেও নতুন প্রধানমন্ত্রী শপথ নিতে পারেননি। তাই আগের প্রেসিডেন্ট ক্লদ জোসেফই দায়িত্বে। প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে এখন চলছে লড়াই।
প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিককালে বিক্ষোভ হলেও তার নিহত হওয়ার ঘটনা অনেকেই মেনে নিতে পারছে না। হাইতি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার প্রফেসর রবার্ট ফ্যাটনের মতে, হাইতির ইতিহাসের সবচেয়ে ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা। হাইতির মতো অস্থিতিশীল দেশের জন্যও প্রেসিডেন্টকে এভাবে হত্যার ঘটনা খুবই অস্বাভাবিক এবং গভীর উদ্বেগের।
সরকার যা বলছে
প্রধানমন্ত্রী ক্লদ জোসেফ বন্দুকধারীদের ‘ভাড়াটে সেনা’ উল্লেখ করে বলেছেন, এরা ছিল বিদেশি, কথা বলছিল ইংরেজি এবং স্প্যানিশ ভাষায়। পুলিশপ্রধান লিও চার্লস বলেছেন, প্রেসিডেন্টকে হত্যা করতে বিদেশিরা এসেছিল। হিট স্কোয়াডের ২৮ সদস্যের পেছনে (২৬ কলম্বিয়ান ও দুই জন মার্কিনি)। রাত ১টার দিকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ময়েস। ওয়াশিংটনে হাইতির রাষ্ট্রদূত বোচিট এডমন্ড বলেন, হামলাকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের মাদক দমন সংস্থার ছদ্মবেশে আসলেও এরা যে মার্কিন এজেন্ট ছিল, সেটা তার মোটেই বিশ্বাস হয় না। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টকে হত্যার জন্য তাদের অর্থ দিয়ে ভাড়া করা হয়েছে। আমি আশা করব তারা আসলে কার হয়ে কাজ করছিল, সেটি তারা প্রকাশ করবে।
প্রাথমিক তদন্তে যা পাওয়া গেছে
স্থানীয় জেলা জজ কার্ল হেনরি ডেস্টিন তদন্তের দায়িত্বে। তিনি গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, প্রাসাদের দরজা, জানালা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। বিছানা তছনছ হয়েছিল। দরজার তালাগুলোও ধ্বংস করে নিচে ফেলে রাখা হয়েছে। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢুকতে হলে পুলিশ চেকপোস্ট এবং প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা দলকে অতিক্রম করেই যেতে হবে। বিচারক ডেস্টিনের বরাত দিয়ে নির্বাচনমন্ত্রী মাথিয়াস পিয়েরে বলেছেন, সেখানে বন্দুকযুদ্ধের কথা বলা হলেও এক জন নিরাপত্তারক্ষীও আহত হননি। তার মতে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে এক জন মাস্টারমাইন্ড আছে যাকে খুঁজে বের করতে হবে। ডেস্টিনও জানিয়েছেন, তিনি নিরাপত্তা বুথে কাউকে পাননি। সেটি অক্ষত ছিল। প্রাসাদের প্রবেশদ্বারে এক জনের সঙ্গে তার সাক্ষাত্ হয়েছে যার কোনো ব্যাজ ছিল না। ঐ রাতে সেখানে ছিল এমন কারো সাক্ষাত্ তিনি পাননি।
দেশীয় ষড়যন্ত্রে হত্যাকাণ্ড!
প্রেসিডেন্টকে হত্যায় বিদেশি ভাড়াটে সেনাদের ওপর সরকার দায় চাপালেও কারা ভাড়া করেছে এবং কীভাবে নিরাপত্তাব্যূহ ভেদ করে বাসভবনে তারা পৌঁছাল তা নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধছে। হাইতির বিরোধী রাজনীতিক, মিডিয়া এবং কলম্বিয়ার মিডিয়া রিপোর্টে বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নানা সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। শুক্রবার বিরোধী রাজনীতিক এবং সাবেক সিনেটর স্টিভেন বেনয়েট স্থানীয় রেডিও স্টেশন ম্যাজিক৯ কে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বলেন, কলম্বিয়ানরা নন, দেহরক্ষীরাই হত্যা করেছে প্রেসিডেন্টকে।
কলম্বিয়ান ম্যাগাজিন ‘সিমানা’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, কলম্বিয়ার সাবেক সৈন্যরা এসেছিল ময়েসকে নিরাপত্তা দিতে। কারণ তিনি হত্যার হুমকি পাচ্ছিলেন। কলম্বিয়ার সংবাদপত্র এল টাইম্পো এক রিপোর্টে সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্সিয়াল কম্পাউন্ডের সিকিউরিটি ফুটেজে দেখা গেছে, কলম্বিয়ার সৈন্যরা মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টা ৩০ মিনিট থেকে ২টা ৪০ মিনিটের মধ্যে সেখানে পৌঁছায়। অর্থাত্ প্রেসিডেন্টকে হত্যার এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর তারা সেখানে যায়।
রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সের স্কুল শিক্ষক পল রেমন্ড (৪১) নিশ্চিত যে, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় থাকা সদস্যরাই বেইমানি করেছে। যারা প্রেসিডেন্টকে চেনে এবং তার বাসভবন সম্পর্কে জানে তারাই এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে। রেমন্ড আরো বলেন, প্রেসিডেন্টের এক জন দেহরক্ষীও আহত হননি, এমনকি তার পোষা কুকুরটিও। সাবেক কংগ্রেসম্যান আলফ্রেডো অ্যান্তোনিও মনে করেন, ‘হাইতির শক্তিশীল ও প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আছে। কারণ তারা চায় না তাদের স্বার্থকে কেউ হত্যা করুক’। এতে ধারণা করা হচ্ছে, দেশের একটা গোষ্ঠীই প্রেসিডেন্টকে হত্যা করতে বিদেশি সাহায্য নিয়েছে।
প্রেসিডেন্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য এবং সরকারেরর এক আহ্বানে সন্দেহ আরা নানা দিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। সরকার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় জাতিসংঘ ও মার্কিন সৈন্য মোতায়েনের দাবি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তা নাকচ করে দিয়েছে। তবে দেশটি তদন্তে সহযোগিতা করতে এফবিআই ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে হাইতি পাঠাচ্ছে। থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্সের হাইতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জেইক জনস্টন বলেন, হাইতিতে মার্কিন সৈন্য পাঠানো কোনো সমাধান নয়। এটা একটা মানসিক ব্যাপার মাত্র। তিনি এটা বুঝতে শতাব্দী জুড়ে হাইতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, প্রায় দুই দশক ধরে হাইতিতে দখলদারিত্ব বজায় রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯১৫ সালে তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জঁ ভিলব্রুন গিলিয়াম স্যামকে হত্যা করা হয়েছিল। তরুণ রাজনীতিক ও অ্যাক্টিভিস্ট কিনসলে জ্যঁ বলেন, ‘শেষবার হস্তক্ষেপ করেছিল জাতিসংঘ। তখন হাইতিতে কলেরা দেখা দিয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। আমাদের এখন ঠিক যা প্রয়োজন তা তো এটা নয়।’
ল্যাটিন আমেরিকা বিষয়ক থিংক ট্যাংক ডিফেন্স ওভারসাইটের ওয়াশিংটন অফিসের পরিচালক অ্যাডাম ইসাকসন জানান, কলম্বিয়ায় প্রয়োজনের চেয়ে প্রশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা অনেক। তাই এরা প্রাইভেট মিলিটারি কনট্রাকটরের হয়ে কাজ করে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যেও এদের যুদ্ধের জন্য ভাড়ায় নেওয়া হয়। কলম্বিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেয়ে এরা এভাবেই অনেক বেশি অর্থ আয় করে। আবার অনেক মাদক পাচারকারী এবং ভূমিদস্যুরা এদের ভাড়া করে।
তথ্যসূত্র : দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন ও বিবিসি