করোনা পরিস্থিতি

ব্রিটেনের পথে হাঁটবে না নিউজিল্যান্ড

এম এ আলআমিন

 

করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় নিউজিল্যান্ড ব্রিটেনের দেখানো পথে হাঁটবে না বলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। কয়েক দিন আগে ব্রিটেনে মহামারি সতর্কতা শিথিলের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ভাষায় এটি হলো ‘লিভ উইথ’ পলিসি। ধরে নেওয়া হচ্ছে কোভিড-১৯ সহসা বিদায় নিচ্ছে না, তাই একে সঙ্গে নিয়ে চলার জন্য মানসিকভাবে তৈরি হতে হবে। তবে আরডের্ন মনে করেন এই ধারণা একেবারেই ‘অগ্রহণযোগ্য’। কারণ মানুষের মৃত্যু স্বাভাবিক বিষয় বলে মেনে নেওয়া যায় না। 

নিউজিল্যান্ড জানিয়েছে, ব্রিটেন যদি জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে তবে দেশটিকে নো ফ্লাই তালিকার মধ্যে রাখা হবে। এর অর্থ যেসব দেশ থেকে ফ্লাইট আসা নিষিদ্ধ সেই তালিকায় ব্রিটেনও থাকবে। ৫ জুলাই জনসন জনসমক্ষে ফেসমাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিধি তুলে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান। এটি ১৯ তারিখ থেকে বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভাইরাসের সঙ্গে বেঁচে থাকার কৌশল আমাদের শিখতে হবে। তিনি এমন এক সময় এ ঘোষণা দিলেন যখন মহামারি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে, দুঃখজনক সত্য হলো কোভিডে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকবে।’ তার     এই বক্তব্যের পরদিন নিউজিল্যান্ডের কোভিড-১৯ রিসপন্স মন্ত্রী ক্রিস হিপকিন্স এক সংবাদ সম্মেলনে  বলেন, ‘নিউজিল্যান্ডে আমরা এই রীতি অনুসরণ করতে পারি না।

যুক্তরাজ্য সরকারের বক্তব্যে এটি পরিষ্কার যে সেখানে কোভিড রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।’ প্রধানমন্ত্রী আরডের্নকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঐ সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি আরো বলেন, ‘নাটকীয় পরিবর্তনের আশা বাদ দিয়ে আমাদের ধীর গতিতেই এগোতে হবে। এভাবে একটা সময় কোভিড থেকে আমরা মুক্তি পাব’। আরডের্নকে উদ্দেশ্য করে সেখানে প্রশ্ন করা হয় যে, কোভিডের ফলে মৃত্যুকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা হবে কি না, জবাবে তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে একেক দেশের একেক রকম দৃষ্টিভঙ্গি। আমার কাছে অগ্রাধিকার হলো যে পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা এতদিন করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি সেটি অব্যাহত রাখা। খুব দ্রুত কোনো বড় পরিবর্তন আশা করা যায় না।’ নিউজিল্যান্ডের স্বাস্থ্য মহাপরিচালক অ্যাশলি ব্লুমফিল্ড ৭ জুলাই বলেন, তার দেশ যুক্তরাজ্যের অবস্থা ‘গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ’ করবে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় নো ফ্লাই লিস্টে রাখবে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে কোভিড রোগীর সংখ্যা না বাড়লে বা সে দেশ থেকে আসা লোকজনের মধ্যে মহামারি বিস্তারের ঝুঁকি বেশি না হলে আমরা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব’।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ভারতের ব্যাপারে এপ্রিলে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যুক্তরাজ্যের বেলায়ও এখন তা করা হবে। তিনি জানান, নিউজিল্যান্ড প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি দেশের অবস্থা পর্যালোচনা করে নো ফ্লাই তালিকা আপডেট করে। দেশটির মহামারি বিশেষজ্ঞ এবং ওটাগো ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথ প্রফেসর মাইকেল বেকার বলেন, ব্যাপকসংখ্যক টিকাদান এবং মাস্ক ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা এই দুইয়ের ওপর নির্ভর করছে তাদের করোনা প্রতিরোধে ভবিষ্যত্ রোডম্যাপের রূপরেখা। এজন্য প্রয়োজনে সীমিত আকারের লকডাউন দেওয়া যেতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ, টিকাদানে সমতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনগণের চলাচলের স্বাধীনতা সবগুলো মাপকাঠিতেই নিউজিল্যান্ডের অবস্থা খুবই আশাপ্রদ।

অস্ট্রেলিয়ার কোভিড সতর্কতা এতদিন নিউজিল্যান্ডের মতোই ছিল। তবে জনসনের ঐ ঘোষণার পর অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন এ বিষয়ে তার সরকারের অবস্থান নমনীয় করতে যাচ্ছেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। তিনি বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে চার স্তর রোডম্যাপের কথা বলেছেন। এর তৃতীয় স্তরে বলা হয়েছে, কোভিড অন্যান্য সংক্রামক ফ্লুয়ের মতো গণ্য করে তার চিকিত্সা করা হবে। তবে বেকার মনে করেন, সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য এটি যথেষ্ট নয়। এতে বহু লোকের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর কাছ থেকে এ ধরনের বাগাড়ম্বর অনেক শুনেছি। বস্তুত কোভিড মোকাবিলায় যারা যথেষ্ট হতে পারেনি তাদের দৃষ্টান্ত আমরা অনুসরণ করতে পারি না। তাদের রীতি পদ্ধতি অনুসরণের আগে আমাদের অবশ্যই সবকিছু ভালো করে ভেবে দেখতে হবে।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের গোড়া থেকে বিশ্বে করোনা মহামারি দেখা দেওয়ার পর যে অল্প কয়েকটি দেশ সংক্রমণ প্রতিরোধে সাফল্য দেখিয়েছে নিউজিল্যান্ড তার মধ্যে একটি। দেশটিতে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৭৬৫ জনের করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে, এদের মধ্যে মারা গেছে ২৬ জন। পক্ষান্তরে যুক্তরাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ লাখ ৫৮ হাজার, যাদের মধ্যে মারা গেছে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার মানুষ।