অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিতে হইবে

মার্কিন সিনেটের নূতন একটি প্রস্তাবিত বিলের নাম ‘গ্লোবাল লেবার সাপোর্ট অ্যাক্ট অব ২০২১’। গত ১৭ জুন সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ও ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর বব মেনেনডেজ ইহা উপস্থাপন করিয়াছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে জো বাইডেনের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মাথায় বিশ্ব জুড়িয়া শ্রমিক অধিকার সুরক্ষার জন্য মার্কিন সিনেটে নূতন এই বিল প্রস্তাবের বিষয়টি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। এই বিলে বাংলাদেশের শ্রম অধিকারের প্রসঙ্গটি আসিয়াছে গুরুত্ব সহকারে। ইহাতে রানা প্লাজা ধসের সাত বত্সর পর তৈরি পোশাক-কারখানার অবকাঠামোগত নিরাপত্তার উন্নতিতে সন্তোষ প্রকাশ করা হইয়াছে। ঢাকার সাভারের রানা প্লাজার ভয়াবহ এই ঘটনাটি ঘটে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। এই ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক নিহত হন। আহত হন ২ হাজার ৪৩৮ জন শ্রমিক, যাহাদের অনেকে এখনো পঙ্গুত্বকে বরণ করিয়া বাঁচিয়া আছেন কোনোরকমে। এই ঘটনার পর কলকারখানাসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা লইয়া প্রশ্ন উঠে। বেশ কয়েকটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়ও উঠিয়া আসিয়াছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। রানা প্লাজা ধসিয়া পড়িবার কারণ সম্পর্কে পোশাকশিল্প-মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ৯টি কারণ চিহ্নিত করে। যেমন—নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, নিচু মানের পিলার, ফ্লোরে জেনারেটর স্থাপন, বয়লার ও ভারী মেশিন স্থাপন, অতিরিক্ত কাঁচামাল ও ধারণক্ষমতার অধিক কর্মী ইত্যাদি।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক ক্রেতাগণ নড়িয়াচড়িয়া বসেন। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের পোশাকশিল্পের নিরাপত্তা বিধান ও কর্মপরিবেশের উন্নয়নে গঠিত হয় ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও আমেরিকার ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্স। অ্যাকর্ড হইল ২০টি দেশের ২০০ ক্রেতার জোট। তাহারা কারখানার অবকাঠামোগত নিরাপত্তার উন্নয়নে পোশাকশিল্প মালিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন এবং সহযোগিতা করেন নানাভাবে। তাহারা ২ হাজারের অধিক পোশাককারখানা পরিদর্শন করিয়া বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি চিহ্নিত করেন। তবে ইহার বাহিরেও অনেক কারখানা ছিল, সেইগুলি সংস্কারকাজের আওতায় আনিতে এনটিএপির অধীনে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) পরিদর্শন কাজ করে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নেতৃত্বে ও ডিআইএফই-এর তত্ত্বাবধানে গঠিত সংশোধন সমন্বয় সেল (আরসিসি) কারখানাগুলোর দেখভাল করিতেছে; কিন্তু নিরাপত্তাগত ত্রুটির সংস্কারকাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নহে। এখনো কয়েক শত কারখানা রহিয়াছে, যাহা পরিদর্শন কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব হয় নাই। কেননা সেইগুলি বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য নহে। এই সকল কারখানায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটিলে তাহার দায় কে নিবেন?

ক্রেতাদের দুই জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স এই দেশ হইতে গত বত্সর কার্যক্রম গুটাইয়া লইয়াছে। তাহারা যে কাজ করিয়া গিয়াছেন তাহা প্রশংসীয়। তাহাদের আন্তরিকতার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক তাহার হারানো বাজার ফিরিয়া পাইয়াছে। এই শিল্পের ভাবমূর্তির উন্নতি হইয়াছে। বর্তমানে অ্যাকর্ডের কার্যক্রমকে আগাইয়া নিতে আরএমজি সাসটেইনিবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) গঠিত হইয়াছে এবং অ্যালায়েন্সের তত্ত্বাবধানে থাকা কারখানাগুলি দেখভাল করিতে নিরাপন নামের একটি সংস্থা গঠিত হইলেও তাহা এখন আর নাই। তবে ডিআইএফই ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি ইউনিট গঠন করিয়া তাহার অধীনে আরসিসি ও আরএসসিকে লইয়া আসা আজ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। কিছুদিন পূর্বে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি ফুড ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিক শ্রমিকের মৃত্যুবরণের পর প্রমাণিত হইয়াছে যে, শুধু পোশাকশিল্প লইয়া ভাবিলেই চলিবে না, রপ্তানিমুখী ও অরপ্তানিমুখী সকল শিল্পকলকারখানায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা জোরদার করিতে হইবে। কর্মপরিবেশের উন্নয়নে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের মতো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করিতে হইবে। তাহাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিতে হইবে। অন্যদিকে শুধু কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরই নহে, এই সকল ভবন নির্মাণের পূর্বে ভবনের নিরাপত্তার জন্য নকশা পাশ করাসহ নানা বিষয় দেখভাল করিতে অন্য যেই সকল সরকারি সংস্থা রহিয়াছে, তাহাদেরও এই ব্যাপারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হইবে।