হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন কর্মস্থানে হরহামেশাই আমাদের চোখে পড়ে অল্পবয়সি শিশুদের সরব উপস্থিতি। করোনা মহামারির তাণ্ডবে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিশুই নতুন করে যোগ হচ্ছে শ্রমিকের তালিকায়। জাতীয় শিশুশ্রম পরিষদের জরিপে জানা যায়, দেশে ১৭ লাখ শিশু পূর্ণকালীন শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। তাদের মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই নিয়োজিত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অপেক্ষাকৃত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। এ ছাড়া ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে সব মিলিয়ে সপ্তাহে কমপক্ষে এক ঘণ্টার কর্মে নিয়োজিত থাকে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু, করোনার এই সময়ে যা আরো বেড়েছে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইনে ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নেওয়া নিষিদ্ধ। আইন অনুযায়ী ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কাজে নেওয়া গেলেও ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কাজে নেওয়া যাবে না। জাতীয় শিশুনীতি ২০১১ অনুসারে, ৫ থেকে ১৮ বছরের শিশু কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে পারবে না। ৫ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত শিশুশ্রম নিয়োগকর্তার জন্য দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু হতাশাজনক যে, আইন শুধু কাগজে-কলমেই। দিবালোকে অসংখ্য শিশু ঝুঁকিপূর্ণ নানান কাজে নিয়োজিত স্বয়ং আইন প্রণয়নকারী থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—সবার দৃষ্টির সামনেই। অথচ নেই আইনের কার্যকারিতা।
সরকার ২০০১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম সম্পর্কিত আইএলও কনভেনশন-১৮২ অনুসমর্থন করে। দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে শিশু শ্রমিক কমিয়ে আনার। সরকারের অঙ্গীকার ছিল ২০১৬ সালের মধ্যে দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম শূন্যে নিয়ে আসার। কিন্তু সেই মেয়াদ পার হয়েছে আরো প্রায় পাঁচ বছর আগেই। দুই দশক ধরে শিশুশ্রম বেড়েই চলেছে। বিশ্ব জুড়ে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ২০২০ সালে ১৬ কোটি অতিক্রম করেছে।
২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চার বছরে এই তালিকায় যোগ হয়েছে ৮৪ লাখ নতুন নাম, যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। আগামী দুই বছরে আরো ৫ কোটি শিশু শ্রমিক বাড়তে পারে।
ইউনিসেফের প্রধান হেনরিয়েত্তা ফোর বলেন, শিশুশ্রম বন্ধের লড়াইয়ে আমরা হারতে বসেছি। করোনা ভাইরাস মহামারি আমাদের অনেক পেছনে ঠেলে দিয়েছে। বৈশ্বিক লকডাউন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, অচল অর্থনীতি ও জাতীয় বাজেট সংকোচনের দ্বিতীয় বছর চলছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করে কাজে পাঠানোর কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
আইএলও ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসন করতে চায়। বাস্তবায়নে সরকারের একই লক্ষ্য থাকলেও অগ্রগতি কম। প্রতিটি শিশু আগামীর ভবিষ্যত্, এক একটা সদ্য ফোটা ফুল। এভাবে যদি শিক্ষালয় ছেড়ে শ্রমের কঠিন ঠিকানায় তারা হারিয়ে যেতে থাকে, তাহলে ফুলের সৌরভ আসবে কোথা থেকে! শিশুশ্রম নিরসনে আরো ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তোলা উচিত। শিশুশ্রম দমন আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা অপরিহার্য।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জামেয়া দ্বীনিয়া মৌলভীবাজার, রাজনগর, মৌলভীবাজার